মানিক চৌধুরীর মরণোত্তর সন্মাননা গ্রহণ করছেন দীপংকর চৌধুরী কাজল ২৭ ২ ২০১১ইং

বুধবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১১

পটিয়ায় মানিক চৌধুরী স্মৃতি আন্তঃ ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনাল

                                        
                                   মানিক চৌধুরী স্মৃতি আন্তঃ ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনালে চ্যাম্পিয়ন ট্রফি বিতরণ করছেন শামসুল হক চৌধুরী এমপি। 


পটিয়া উপজেলার হাবিলাসদ্বীপ সমাজকল্যাণ সংসদের উদ্যোগে মানিক চৌধুরী স্মৃতি আন্তঃ ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলা ২সেপ্টেম্বর বিকালে স্থানীয় ব্যাংক ময়দানে অনুষ্ঠিত হয়। খেলায় আন্ত:সংসদ নীল দল ৫-৪ গোলে লাল দলকে পরাজিত করে চ্যাম্পিয়ন হয়। খেলা শেষে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সংসদ সদস্য শামসুল হক চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবুল হোসেন, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ডা. তিমির বরণ চৌধুরী, পৃষ্ঠপোষক দিপংকর চৌধুরী, জেলা আওয়ামী লীগ নেতা নুরুল হাকিম, ডা. পঞ্চানন চক্রবর্তী, গৌরাঙ্গ প্রসাদ নন্দী, ইউনুস খান, মৃদুল নন্দী, প্রিয়ব্রত দাশগুপ্ত ও উজ্জ্বল পাল। বিজ্ঞপ্তি সূত্রঃকালের কন্ঠ 

সোমবার, ৮ আগস্ট, ২০১১

আগড়তলা মামলার অন্যতম আসামি ভূপতিভূষণ চৌধুরী (মানিক চৌধুরী)

তপন কুমার দে
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামি ছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অন্যতম সহযোগী চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনের প্রবাদপুরুষ জহুর আহমেদ চৌধুরীর অন্যতম সহযোগী ভূপতিভূষণ চৌধুরী ওরফে মানিক চৌধুরী।
চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনে অন্যতাম সিংহপুরুষ বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক চৌধুরী ১৯৩০ সালের ১৬ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের পটিয়া থানার হাবিলসদ্বীপ গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ধীরেন্দ্র লাল চৌধুরী এবং মাতার নাম যশোদা বালা চৌধুরী। চট্টগ্রাম শহরের রামজয় মহাজন লেনের পৈত্রিক বাড়ি থেকে লেখাপড়ার হাতেখড়ি। ছোটবেলা থেকে তিনি খুবই মেধাবী ছাত্র ছিলেন, যা প্রতিনিয়ত প্রমাণ করেছেন মানিক চৌধুরী। চট্টগ্রামের মিউনিসিপ্যাল স্কুল থেকে ইংরেজিতে লেটারসহ প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাশ করে কলকাতা যান পড়াশোনা করতে। বঙ্গবাসী কলেজে অধ্যয়নরত অবস্থায় রাজনীতির হাতেখড়ি এবং ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে যোগ দেন। আইএ পাশ করেন প্রথম বিভাগে।
ইতোমধ্যে পিতার মৃত্যুতে দেশে ফিরে আসেন এবং লেখাপড়ার ইতি ঘটিয়ে পারিবারিক ব্যবসা-বাণিজ্যে আত্মনিয়োগ করেন। মানিক চৌধুরীর প্রকৃত নাম ভূপতিভূষণ চৌধুরী। জমিদার ধীরেন্দ্র লাল চৌধুরীর একমাত্র ছেলে ছিলেন তিনি। প্রফুল্ল চৌধুরী ও তেজেন্দ্র চৌধুরী তার পিতৃব্য। তিনি অল্প বয়সে পিতৃহীন হন। প্রফূল্ল চৌধুরীর কোন ছেলে সন্তান ছিল না। তাদের পুরনো গদি ছিল খাতুনগঞ্জে। পরে তারা সত্যেন্দ্র কবিরাজের বিল্ডিং খরিদ করে আছাদগঞ্জে তথা পোস্ট অফিসের গলির মুখে চলে আসেন। বাবার মৃত্যুর পর প্রকৃতপক্ষে কাকার স্নেহ-ভালবাসাতেই তিনি বড় হন।
তিনি ছিলেন আজীবন অসম্প্রদায়িক প্রগতিশীল চিন্তা চেতনার মানুষ। অন্যান্য হিন্দুদের মতো দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া বা একই সঙ্গে ভারত পাকিস্তানের নাগরিক হওয়ার মতো সুবিধাবাদী কখনও তিনি ছিলেন না। বিপুল অর্থ উপার্জন করতেন আর খরচ করতেন দু’হাতে। সেজন্য বিপুল আয় সত্ত্বেও লাগামহীন ব্যয়ের কারনে তার কোন আপসোসও ছিল না। তিনি বেহিসেবী ও বেপরোয়া জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন। জন এফ কেনেডি যাকে ঝুকিঁর মুখে সাহসিকতা বলেছেন তা তার মধ্যে পুরোপুরি বিদ্যমান ছিল। বিপদে বিচলিত হয়েছেন কদাচিৎ । মনেপ্রাণে ভালবাসতেন বাংলাদেশকে। তাই সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কলকাতা বা বাংলাদেশের বাইরে কোন সম্পত্তি অর্জন করেন নি। জেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ ছিলেন তিনি। ১৯৬৬ সালের পূর্ব পর্যন্ত তার পরিবার ও তিনি আওয়ামী লীগের কত উপকার করেছেন তার কোন হিসেব নেই। ১৯৬৪ সালে আছাদগঞ্জে রামজয় মাহজন লেনে সর্বদলীয় এক মিছিলে মুসলিম লীগের গুণ্ডারা হামলা চালালে এমএ আজিজ, এমএ মান্নান, ছাত্রলীগের সিটি শাখার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারী আবুল কালাম আজাদ সহ অনেকে মারাত্মকভাবে আহত হন। গুণ্ডারা হাফেজ মো. শরীফ এবং নূর মোহাম্মদ  এর কান কেটে দেয়। এমএ আজিজ তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা বিভূতিভুষণ চৌধুরীর( মানিক চৌধুরী) বাসায় আশ্রয় নেন। এ সময় গুণ্ডাদের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য মানিক চৌধুরীর মা নিজের গলার সোনার চেইন ছিঁড়ে রাস্তায় ছুঁড়ে মারেন। গুণ্ডারা সোনার চেইনের বিচ্ছিন্ন টুকরাগুলো খুঁজে নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়লে এমএ আজিজ তাদের আক্রমণ থেকে প্রাণে রক্ষা পান।
রাজনীতি করতে গিয়ে তিনি গাঁটির পয়সা খরচ করেছেন, রাজনীতি থেকে কোন ফায়দা আদায় করেননি। একান্নবর্তী পরিবারের সদস্য ছিলেন, ঝড়ঝাপটা সব গেছে পরিবারের ওপর দিয়ে। তার সঙ্গে জহুর আহমদ চৌধুরীর সম্পর্ক ছিল সহোদর ভ্রাতার মতো।
১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের অল্পকাল পরে শ্রী চৌধুরী মওলানা ভাসানীর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে আসেন এবং পরবর্তীতে মুসলিম লীগবিরোধী অসাম্প্রদায়িক আন্দোলনে যোগ দেন। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকে তিনি এ সংঘঠনের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েন এবং মরহুম এমএ আজিজ, মরহুম জহুর আহমদ চৌধুরীর সঙ্গে একত্রে চট্টগ্রামে সংগঠন গড়ে তোলার কাজে ব্যাপৃত হন। ৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনকালীন শ্রী চৌধুরী এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং মরহুম হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সংস্পর্শে আসেন। এ সময়ই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তার প্রগাঢ় বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে এবং জেলা আওয়ামী লীগের কোষঅধ্যক্ষ হিসেবে নির্বাচিত হন। ৬২ সালের সামরিক আইনবিরোধী আন্দোলনসহ গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল আন্দোলন বিশেষ করে ৬ দফা আন্দোলনে তার ভূমিকার জন্য তিনি চট্টগ্রামের রাজনীতিতে অন্যতম মুখ্য ব্যক্তিতে পরিণত হন। ১৯৬৬ সালের ২০মে রাতে পাকিস্তান প্রতিরক্ষা আইনে তাকে গ্রেফতার করা হয় এবং তথাকথিত আগরতলা ষড়যস্ত্র মামলায় জড়িত করে তার বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার অভিযোগ আনা হয়। তাকে কারাগারে চরমভাবে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে তিনি আবার মুক্তি পান কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যে ইয়াহিয়ার সামরিক জান্তা তাকে আবার গ্রেফতার করে। ৭০-এর শেষ দিকে জেল থেকে ছাড়া পান। স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনে সক্রিয় অংশ নেন। মুক্তিযুদ্ধকে সংগঠিত করার কাজে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন।
মানিক চৌধুরী বিডিও হয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৬৫ সালে জহুর আহমদ চৌধুরী জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে পরাজিত হলে মানিক চৌধুরী তার আইডেন্টিটি কার্ড টুকরো টুকরো করে ছুঁড়ে ফেলে দেন। সেদিন যারা বিডি হিসেবে জহুর আহমদ চৌধুরীর বিরোধীতা করেছে আজ তাদের অনেকেই আওয়ামী লীগ নেতা ও রাষ্ট্রদূত। মানিক চৌধুরী কখনও সে রকম করেননি। সুদিনে-দুর্দিনে তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর নিত্যসঙ্গী।
এখানে উল্লেখ্য, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ আওয়ামী লীগের সে যুগের তিনজন প্রভাবশালী নেতা ডা. সাইদুর রহমান চৌধুরী ( সহ-সভাপতি, চট্টগ্রাম সিটি আওয়ামী লীগ), ভূপতি ভূষণ চৌধুরী ওরফে মানিক চৌধুরী( কোষাধ্যক্ষ, চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগ), বিধান কৃষ্ণ সেনকে ( সাংগঠনিক সম্পাদক , চট্টগ্রাম শহর আওয়ামী লীগ) গ্রেফতারপূর্বক অভিযুক্ত করা হয়েছিল। বাংলাদেশের আর কোথাও কোন আওয়ামী লীগ এবং তার সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগের কোন কর্মীকে তথাকথিত আগরতলা মামলায় পাকিস্তান সরকার অভিযুক্ত করেনি। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধু, চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের তিন নেতা, সিভিল সার্ভিস ও সেনাবাহিনীসহ মোট ৩৫ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল।
তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি ও চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে খ্যাত ডা. সাইদুর রহমান চৌধুরী, মানিক চৌধুরী ও বিধান কৃষ্ণ সেনের নিয়মিত আড্ডা ছিল চট্টগ্রাম স্টেশন রোডের রেস্ট হাউজের ২৩ নং রুমে।
বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামের ধারাবহিকতায় মূলত ১৯৬২ সালের আইয়ুবের সামরিক শাসন বিরোধী এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মুক্তি আন্দোলনের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানে নবজাগরনের সূত্রপাত ঘটে। আর ১৯৭০ এর সাধারণ নির্বাচন এবং ১৯৭১-এর রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার দ্বারাই এ আন্দোলনের সফল পরিসমাপ্তি ঘটে। সে সময়কার ছাত্র-জনতার সব মিছিলে নেপথ্যে সহায়তা প্রদানকারী ছিলেন মানিক চৌধুরী। এমনকি কোন সময় মানিক চৌধুরী মিছিলের অগ্রভাগে থেকে আবার কোন সময় মিছিলের শেষভাগে থেকে সবাইকে উৎসাহ জোগাতেন।  রাজনৈতিক মিটিং- মিছিল শেষে বাণী কোম্পানির ( লালদীঘির সোনালী ব্যাংকের কাছে) মাইকের খরচ, কর্মীদের আপ্যায়ন, প্রচারকার্যে  ব্যবহৃত ঘোড়ার গাড়ি ও বেবিট্যাক্সির ভাড়া দেয়ার জন্য যখন সব নেতাকর্মী বিব্রতকর অবস্থায় পড়তেন তখনই দেখা যেত ঘটনাস্থলে মানিক চৌধুরী এসে তার সহজ-সরল সমাধান করে দিতেন।
স্বাধীনতা- উত্তর সময়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তার রাজনৈতিক মতপার্থক্য ঘটে এবং তিনি নতুন দল জাতীয় গণমুক্তি ইউনিয়ন( জাগমুই) প্রতিষ্ঠায় কার্যকর ভূমিকা পালন করেন। বিশেষ ক্ষমতা আইনের আওতায় তাকে ৭৪ সালের এপ্রিল মাসে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৭৫ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট তাকে মুক্তির নির্দেশ দানের পরপরই জরুরি আইনের আওতায় আবর গ্রেফতার করা হয়। ৭৫-এর জুনে জেলখানা থেকে আবার ছাড়া পান। ইতিহাসের কালো অধ্যায় ১৯৭৫-এর আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর জাতীয় নেতা তাজউদ্দিন আহমদসহ তাকে আবারও ঢাকা থেকে গ্রেফতার করে তার বিরুদ্ধে এক মিথ্যা মামলা দায়ের করে সামরিক আইনের আওতায় সাজা  দেয়া হয়। ১৯৭৫-এর আগস্ট হতে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছর বন্দি জীবন যাপন করেন। বন্দি অবস্থায় তৎকালীন সামরিক শাসক ও বাংলার রাজনীতিতে অনেক ঘটনা-দুর্ঘটনার নায়ক এবং বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা স্বঘোষিত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তাকে নানা প্রলোভন দেখিয়ে তার দলে যোগদান করার প্রস্তাব দেন। সচেতন এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বলীয়ান বলে স্বভাবতই তিনি জিয়ার সব প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। সব রক্তচক্ষু ও সব ধরনের চাপ এবং অত্যাচারের পরও মানিক চৌধুরীকে জেলে আটক রাখতে পারেনি সামরিক সরকার। এক সময় সরকার তাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।
১৯৮০ সালের ১৮ মার্চ মানিক জেলখানা হতে মুক্ত হন। জেলে থাকা অবস্থায় অমানুষকি নির্যাতনের ফলে ভেতরে ভেতরে ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন। জেল থেকে মুক্ত হবার পর তিনি চিকিৎসার জন্য তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু সাবেক মন্ত্রী ও রাষ্ট্রদূত ঢাকার গাজীপুরের সামসুল হককে সঙ্গে নিয়ে কলকাতায় গমন করেন। কলকাতায় চিকিৎসকরা বলেন, তার চিকিৎসার দেরি হওয়ার কারনে এবং জেলের খাটুনিতে দুরারোগ্য ব্যাধি তাকে দুর্বল করে ফেলেছে। ফলে সব বাধা ও বান্ধনকে পেছনে ফেলে ১৯৮০ সালের ৩০ জুন ভোরে কলকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্বাধীনতা সংগ্রামের বীর সৈনিক মানিক চৌধুরী পরলোক গমন করেন। চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনের সিংহপুরুষ মানিক চৌধুরী। রাজনীতি বা দেশের জন্য তিনি শুধু দিয়ে গেছেন কিছু প্রাপ্তির আশা করেননি। এ মহান বীর মুক্তিযোদ্ধা চট্টলাপ্রেমী মানুষটিকে স্মরণ করা সবার নৈতিক দায়িত্ব।
রাজনৈতিক কর্মকান্ডে সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়াও প্রয়াত মানিক চৌধুরী বিভিন্ন জনহিতকর সামাজিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত ছিলেন। হাবিলাসদ্বীপ উচ্চ বিদ্যালয়, হুলাইন সালেহ- নূর কলেজ প্রতিষ্ঠায় তার অবদান অবিস্মরণীয়। মানিক চৌধুরীর মতো নক্ষত্রসম ব্যক্তিরা আমাদের প্রজন্মের জন্য নমস্য পুরুষ। কিন্তু আমরা অকৃজ্ঞ জাতি এসব মহান ব্যক্তির স্মরণ করতে কৃপণতা করি। বর্তমান প্রজন্মের জন্য এবং জাতির এ সময়ে মানিক চৌধুরীর মতো নেতার খুবই প্রয়োজন। চট্টগ্রামের রাজনীতিতে মানিক চৌধুরীর মতো আদর্শবান রাজনীতিবিদকে স্মরণ করার মাধ্যমে আমরা আমাদের বর্তমান প্রজন্মের জন্য একটি প্রকৃত বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা বাস্তবায়ন করতে পারব।

মানিক চৌধুরীর মৃত্যুবার্ষিকীতে স্মরণসভা

বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক মানিক চৌধুরীর (ভূপতিভূষণ চৌধুরী) মৃত্যুবার্ষিকীতে স্মরণসভা করেছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সংরক্ষণ পরিষদ ডবলমুরিং থানা শাখা। গত ৩ জুলাই উত্তর আগ্রাবাদে সংগঠন কার্যালয়ে স্মরণসভায় সভাপতিত্ব করেন মুক্তিযোদ্ধা কাজী গোলাম সরওয়ার মনজু। মফিজুল আলম চৌধুরীর পরিচালনায় স্বাধীনতা যুদ্ধে মানিক চৌধুরীর অবদান এবং তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনা করেন হারুন-অর-রশিদ, অরুণ চন্দ্র পাল, শরীয়ত উল্লা, সৈয়দ আহমদ, বোধিপাল বড়ূয়া ও জামাল উদ্দীন। সংবাদ বিজ্ঞপ্তি।

সূত্রঃসমকাল

মঙ্গলবার, ১৪ জুন, ২০১১

আগড়তলা মামলার অন্যতম আসামি ভূপতিভূষণ চৌধুরী (মানিক চৌধুরী)

তপন কুমার দে
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামি ছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অন্যতম সহযোগী চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনের প্রবাদপুরুষ জহুর আহমেদ চৌধুরীর অন্যতম সহযোগী ভূপতিভূষণ চৌধুরী ওরফে মানিক চৌধুরী
চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনে অন্যতাম সিংহপুরুষ বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক চৌধুরী ১৯৩০ সালের ১৬ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের পটিয়া থানার হাবিলসদ্বীপ গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ধীরেন্দ্র লাল চৌধুরী এবং মাতার নাম যশোদা বালা চৌধুরী। চট্টগ্রাম শহরের রামজয় মহাজন লেনের পৈত্রিক বাড়ি থেকে লেখাপড়ার হাতেখড়ি। ছোটবেলা থেকে তিনি খুবই মেধাবী ছাত্র ছিলেন, যা প্রতিনিয়ত প্রমাণ করেছেন মানিক চৌধুরী। চট্টগ্রামের মিউনিসিপ্যাল স্কুল থেকে ইংরেজিতে লেটারসহ প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাশ করে কলকাতা যান পড়াশোনা করতে। বঙ্গবাসী কলেজে অধ্যয়নরত অবস্থায় রাজনীতির হাতেখড়ি এবং ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে যোগ দেন। আইএ পাশ করেন প্রথম বিভাগে।
ইতোমধ্যে পিতার মৃত্যুতে দেশে ফিরে আসেন এবং লেখাপড়ার ইতি ঘটিয়ে পারিবারিক ব্যবসা-বাণিজ্যে আত্মনিয়োগ করেন। মানিক চৌধুরীর প্রকৃত নাম ভূপতিভূষণ চৌধুরী। জমিদার ধীরেন্দ্র লাল চৌধুরীর একমাত্র ছেলে ছিলেন তিনি। প্রফুল্ল চৌধুরী ও তেজেন্দ্র চৌধুরী তার পিতৃব্য। তিনি অল্প বয়সে পিতৃহীন হন। প্রফূল্ল চৌধুরীর কোন ছেলে সন্তান ছিল না। তাদের পুরনো গদি ছিল খাতুনগঞ্জে। পরে তারা সত্যেন্দ্র কবিরাজের বিল্ডিং খরিদ করে আছাদগঞ্জে তথা পোস্ট অফিসের গলির মুখে চলে আসেন। বাবার মৃত্যুর পর প্রকৃতপক্ষে কাকার স্নেহ-ভালবাসাতেই তিনি বড় হন।
তিনি ছিলেন আজীবন অসম্প্রদায়িক প্রগতিশীল চিন্তা চেতনার মানুষ। অন্যান্য হিন্দুদের মতো দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া বা একই সঙ্গে ভারত পাকিস্তানের নাগরিক হওয়ার মতো সুবিধাবাদী কখনও তিনি ছিলেন না। বিপুল অর্থ উপার্জন করতেন আর খরচ করতেন দু’হাতে। সেজন্য বিপুল আয় সত্ত্বেও লাগামহীন ব্যয়ের কারনে তার কোন আপসোসও ছিল না। তিনি বেহিসেবী ও বেপরোয়া জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন। জন এফ কেনেডি যাকে ঝুকিঁর মুখে সাহসিকতা বলেছেন তা তার মধ্যে পুরোপুরি বিদ্যমান ছিল। বিপদে বিচলিত হয়েছেন কদাচিৎ । মনেপ্রাণে ভালবাসতেন বাংলাদেশকে। তাই সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কলকাতা বা বাংলাদেশের বাইরে কোন সম্পত্তি অর্জন করেন নি। জেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ ছিলেন তিনি। ১৯৬৬ সালের পূর্ব পর্যন্ত তার পরিবার ও তিনি আওয়ামী লীগের কত উপকার করেছেন তার কোন হিসেব নেই। ১৯৬৪ সালে আছাদগঞ্জে রামজয় মাহজন লেনে সর্বদলীয় এক মিছিলে মুসলিম লীগের গুণ্ডারা হামলা চালালে এমএ আজিজ, এমএ মান্নান, ছাত্রলীগের সিটি শাখার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারী আবুল কালাম আজাদ সহ অনেকে মারাত্মকভাবে আহত হন। গুণ্ডারা হাফেজ মো. শরীফ এবং নূর মোহাম্মদ  এর কান কেটে দেয়। এমএ আজিজ তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা বিভূতিভুষণ চৌধুরীর( মানিক চৌধুরী) বাসায় আশ্রয় নেন। এ সময় গুণ্ডাদের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য মানিক চৌধুরীর মা নিজের গলার সোনার চেইন ছিঁড়ে রাস্তায় ছুঁড়ে মারেন। গুণ্ডারা সোনার চেইনের বিচ্ছিন্ন টুকরাগুলো খুঁজে নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়লে এমএ আজিজ তাদের আক্রমণ থেকে প্রাণে রক্ষা পান।
রাজনীতি করতে গিয়ে তিনি গাঁটির পয়সা খরচ করেছেন, রাজনীতি থেকে কোন ফায়দা আদায় করেননি। একান্নবর্তী পরিবারের সদস্য ছিলেন, ঝড়ঝাপটা সব গেছে পরিবারের ওপর দিয়ে। তার সঙ্গে জহুর আহমদ চৌধুরীর সম্পর্ক ছিল সহোদর ভ্রাতার মতো।
১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের অল্পকাল পরে শ্রী চৌধুরী মওলানা ভাসানীর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে আসেন এবং পরবর্তীতে মুসলিম লীগবিরোধী অসাম্প্রদায়িক আন্দোলনে যোগ দেন। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকে তিনি এ সংঘঠনের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েন এবং মরহুম এমএ আজিজ, মরহুম জহুর আহমদ চৌধুরীর সঙ্গে একত্রে চট্টগ্রামে সংগঠন গড়ে তোলার কাজে ব্যাপৃত হন। ৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনকালীন শ্রী চৌধুরী এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং মরহুম হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সংস্পর্শে আসেন। এ সময়ই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তার প্রগাঢ় বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে এবং জেলা আওয়ামী লীগের কোষঅধ্যক্ষ হিসেবে নির্বাচিত হন। ৬২ সালের সামরিক আইনবিরোধী আন্দোলনসহ গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল আন্দোলন বিশেষ করে ৬ দফা আন্দোলনে তার ভূমিকার জন্য তিনি চট্টগ্রামের রাজনীতিতে অন্যতম মুখ্য ব্যক্তিতে পরিণত হন। ১৯৬৬ সালের ২০মে রাতে পাকিস্তান প্রতিরক্ষা আইনে তাকে গ্রেফতার করা হয় এবং তথাকথিত আগরতলা ষড়যস্ত্র মামলায় জড়িত করে তার বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার অভিযোগ আনা হয়। তাকে কারাগারে চরমভাবে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে তিনি আবার মুক্তি পান কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যে ইয়াহিয়ার সামরিক জান্তা তাকে আবার গ্রেফতার করে। ৭০-এর শেষ দিকে জেল থেকে ছাড়া পান। স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনে সক্রিয় অংশ নেন। মুক্তিযুদ্ধকে সংগঠিত করার কাজে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন।
মানিক চৌধুরী বিডিও হয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৬৫ সালে জহুর আহমদ চৌধুরী জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে পরাজিত হলে মানিক চৌধুরী তার আইডেন্টিটি কার্ড টুকরো টুকরো করে ছুঁড়ে ফেলে দেন। সেদিন যারা বিডি হিসেবে জহুর আহমদ চৌধুরীর বিরোধীতা করেছে আজ তাদের অনেকেই আওয়ামী লীগ নেতা ও রাষ্ট্রদূত। মানিক চৌধুরী কখনও সে রকম করেননি। সুদিনে-দুর্দিনে তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর নিত্যসঙ্গী।
এখানে উল্লেখ্য, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ আওয়ামী লীগের সে যুগের তিনজন প্রভাবশালী নেতা ডা. সাইদুর রহমান চৌধুরী ( সহ-সভাপতি, চট্টগ্রাম সিটি আওয়ামী লীগ), ভূপতি ভূষণ চৌধুরী ওরফে মানিক চৌধুরী( কোষাধ্যক্ষ, চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগ), বিধান কৃষ্ণ সেনকে ( সাংগঠনিক সম্পাদক , চট্টগ্রাম শহর আওয়ামী লীগ) গ্রেফতারপূর্বক অভিযুক্ত করা হয়েছিল। বাংলাদেশের আর কোথাও কোন আওয়ামী লীগ এবং তার সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগের কোন কর্মীকে তথাকথিত আগরতলা মামলায় পাকিস্তান সরকার অভিযুক্ত করেনি। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধু, চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের তিন নেতা, সিভিল সার্ভিস ও সেনাবাহিনীসহ মোট ৩৫ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল।
তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি ও চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে খ্যাত ডা. সাইদুর রহমান চৌধুরী, মানিক চৌধুরী ও বিধান কৃষ্ণ সেনের নিয়মিত আড্ডা ছিল চট্টগ্রাম স্টেশন রোডের রেস্ট হাউজের ২৩ নং রুমে।
বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামের ধারাবহিকতায় মূলত ১৯৬২ সালের আইয়ুবের সামরিক শাসন বিরোধী এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মুক্তি আন্দোলনের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানে নবজাগরনের সূত্রপাত ঘটে। আর ১৯৭০ এর সাধারণ নির্বাচন এবং ১৯৭১-এর রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার দ্বারাই এ আন্দোলনের সফল পরিসমাপ্তি ঘটে। সে সময়কার ছাত্র-জনতার সব মিছিলে নেপথ্যে সহায়তা প্রদানকারী ছিলেন মানিক চৌধুরী। এমনকি কোন সময় মানিক চৌধুরী মিছিলের অগ্রভাগে থেকে আবার কোন সময় মিছিলের শেষভাগে থেকে সবাইকে উৎসাহ জোগাতেন।  রাজনৈতিক মিটিং- মিছিল শেষে বাণী কোম্পানির ( লালদীঘির সোনালী ব্যাংকের কাছে) মাইকের খরচ, কর্মীদের আপ্যায়ন, প্রচারকার্যে  ব্যবহৃত ঘোড়ার গাড়ি ও বেবিট্যাক্সির ভাড়া দেয়ার জন্য যখন সব নেতাকর্মী বিব্রতকর অবস্থায় পড়তেন তখনই দেখা যেত ঘটনাস্থলে মানিক চৌধুরী এসে তার সহজ-সরল সমাধান করে দিতেন।
স্বাধীনতা- উত্তর সময়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তার রাজনৈতিক মতপার্থক্য ঘটে এবং তিনি নতুন দল জাতীয় গণমুক্তি ইউনিয়ন( জাগমুই) প্রতিষ্ঠায় কার্যকর ভূমিকা পালন করেন। বিশেষ ক্ষমতা আইনের আওতায় তাকে ৭৪ সালের এপ্রিল মাসে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৭৫ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট তাকে মুক্তির নির্দেশ দানের পরপরই জরুরি আইনের আওতায় আবর গ্রেফতার করা হয়। ৭৫-এর জুনে জেলখানা থেকে আবার ছাড়া পান। ইতিহাসের কালো অধ্যায় ১৯৭৫-এর আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর জাতীয় নেতা তাজউদ্দিন আহমদসহ তাকে আবারও ঢাকা থেকে গ্রেফতার করে তার বিরুদ্ধে এক মিথ্যা মামলা দায়ের করে সামরিক আইনের আওতায় সাজা  দেয়া হয়। ১৯৭৫-এর আগস্ট হতে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছর বন্দি জীবন যাপন করেন। বন্দি অবস্থায় তৎকালীন সামরিক শাসক ও বাংলার রাজনীতিতে অনেক ঘটনা-দুর্ঘটনার নায়ক এবং বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা স্বঘোষিত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তাকে নানা প্রলোভন দেখিয়ে তার দলে যোগদান করার প্রস্তাব দেন। সচেতন এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বলীয়ান বলে স্বভাবতই তিনি জিয়ার সব প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। সব রক্তচক্ষু ও সব ধরনের চাপ এবং অত্যাচারের পরও মানিক চৌধুরীকে জেলে আটক রাখতে পারেনি সামরিক সরকার। এক সময় সরকার তাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।
১৯৮০ সালের ১৮ মার্চ মানিক জেলখানা হতে মুক্ত হন। জেলে থাকা অবস্থায় অমানুষকি নির্যাতনের ফলে ভেতরে ভেতরে ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন। জেল থেকে মুক্ত হবার পর তিনি চিকিৎসার জন্য তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু সাবেক মন্ত্রী ও রাষ্ট্রদূত ঢাকার গাজীপুরের সামসুল হককে সঙ্গে নিয়ে কলকাতায় গমন করেন। কলকাতায় চিকিৎসকরা বলেন, তার চিকিৎসার দেরি হওয়ার কারনে এবং জেলের খাটুনিতে দুরারোগ্য ব্যাধি তাকে দুর্বল করে ফেলেছে। ফলে সব বাধা ও বান্ধনকে পেছনে ফেলে ১৯৮০ সালের ৩০ জুন ভোরে কলকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্বাধীনতা সংগ্রামের বীর সৈনিক মানিক চৌধুরী পরলোক গমন করেন। চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনের সিংহপুরুষ মানিক চৌধুরী। রাজনীতি বা দেশের জন্য তিনি শুধু দিয়ে গেছেন কিছু প্রাপ্তির আশা করেননি। এ মহান বীর মুক্তিযোদ্ধা চট্টলাপ্রেমী মানুষটিকে স্মরণ করা সবার নৈতিক দায়িত্ব।
রাজনৈতিক কর্মকান্ডে সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়াও প্রয়াত মানিক চৌধুরী বিভিন্ন জনহিতকর সামাজিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত ছিলেন। হাবিলাসদ্বীপ উচ্চ বিদ্যালয়, হুলাইন সালেহ- নূর কলেজ প্রতিষ্ঠায় তার অবদান অবিস্মরণীয়। মানিক চৌধুরীর মতো নক্ষত্রসম ব্যক্তিরা আমাদের প্রজন্মের জন্য নমস্য পুরুষ। কিন্তু আমরা অকৃজ্ঞ জাতি এসব মহান ব্যক্তির স্মরণ করতে কৃপণতা করি। বর্তমান প্রজন্মের জন্য এবং জাতির এ সময়ে মানিক চৌধুরীর মতো নেতার খুবই প্রয়োজন। চট্টগ্রামের রাজনীতিতে মানিক চৌধুরীর মতো আদর্শবান রাজনীতিবিদকে স্মরণ করার মাধ্যমে আমরা আমাদের বর্তমান প্রজন্মের জন্য একটি প্রকৃত বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা বাস্তবায়ন করতে পারব।

রবিবার, ১৭ এপ্রিল, ২০১১

বিপ্লবী মানিক চৌধুরী

স্মরণ
দেশের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে দুজন আওয়ামী লীগ নেতা, তিনজন সিভিল (সিএসপি) কর্মকর্তাসহ নৌ, বিমান এবং সেনাবাহিনী থেকে প্রত্যক্ষভাবে জড়িতদের চিহ্নিত করে মোট ৩৫ জনকে চার্জশিটভুক্ত আসামি করে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা রুজু করা হয়। ১৯৬৮ সালের ১৯ জুন এ রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় ১১ জনকে রাজসাক্ষী এবং দুই শতাধিক সামরিক ও বেসামরিক লোককে সাক্ষী করা হয়। সশস্ত্র বাহিনীর সহস্রাধিক সদস্য বেসামরিক কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং রাজনৈতিক নেতাকে গ্রেফতার করা হয়। এই মামলার আসামি হিসেবে আমাকেও গ্রেফতার করা হয়। ঢাকা সেনানিবাসে স্পেশাল ট্রাইব্যুনালে মামলাটিকে রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব এবং অন্য শিরোনামে রুজু করা হলেও এটাকে দুরভিসন্ধিমূলকভাবে ভারতের ষড়যন্ত্র হিসেবে প্রচার করা হয়, যাতে করে স্বাধীনতাকামী সৈনিক-জনতার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে ক্ষেপিয়ে তোলা যায় ও শেখ মুজিবসহ বিপ্লবী সংগঠকদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে স্বাধীনতা আন্দোলনকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া যায়। ১৯ জুন মামলা শুরু হওয়ার পর আমার সঙ্গে পরিচয় ঘটে অভিযুক্ত চট্টগ্রামের সিটি আওয়ামী লীগের নেতা বিভূতিভূষণ চৌধুরী ওরফে মানিক চৌধুরী এবং বিধানকৃষ্ণ সেনের সঙ্গে। বিচার চলাকালে সব অভিযুক্তের সঙ্গে আমার সখ্য হলেও মানিক চৌধুরীর কথাবার্তায় আমি তার প্রতি বিশেষভাবে আকৃষ্ট হই। মানিক চৌধুরী ও বিধানকৃষ্ণ সেনের সঙ্গে আমার দেখা হতো প্রতিদিন বিকেলে কারাগারের খোলা চত্বরে অথবা খাবার ঘরে। তখন দেখতাম মানিক চৌধুরীর ওপর পাকিস্তানিদের পাশবিক নির্যাতনের চিহ্ন। নির্যাতনে তার কান ও একটা চোখ অকেজো হয়ে যায়। আমাদের ওপর নির্যাতন হলেও লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন, বিধানকৃষ্ণ সেন, মানিক চৌধুরী এবং স্টুয়ার্ড মুজিবের ওপর নির্যাতনের মাত্রা ছিল সীমাহীন। দেখতাম মানিকদা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছেন, তবুও তিনি নিম্নস্বরে হাসিমুখে আমাদের সঙ্গে কথা বলতেন। গৌরবর্ণ ও মাঝারি গড়নের শান্ত সৌম্য মানিক চৌধুরীর অগাধ দেশপ্রেম, দেশকে নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার সঙ্গে পরিচিত হয়ে আমি মুগ্ধ হই। অনেক কথাই হয়েছে তার সঙ্গে। মতান্তরও ছিল কিছু বিষয়ে, কিন্তু মনান্তর হয়নি এক মুহূর্তের জন্য। বন্দি দিনগুলোতে মানিকদার কথোপকথন আমাকে স্মরণ করিয়ে দেয় অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির প্রয়োজনীয়তা। মামলা চলাকালে বঙ্গবন্ধু তার জামাতা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বামী প্রয়াত ওয়াজেদ মিয়ার মাধ্যমে তখনকার ডাকসুর ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদকে আত্দীয় পরিচয়ে অতি গোপনীয়তার সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে মুক্তির আন্দোলন এবং পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলাপ করতেন। মুক্তির আন্দোলন যখন চরমে ওঠে তখন ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ সালে ঢাকা সেনানিবাসে আটক অবস্থায় টয়লেটে যাওয়ার সময় সার্জেন্ট জহুরুল হক এবং ফ্লাইট সার্জেন্ট ফজলুল হককে এক পাকিস্তানি নিরাপত্তারক্ষী সামনাসামনি গুলি করে ও মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য জহুরুলের শরীরে বেয়নেট চার্জ করে। পরে তিনি সিএমএইচে মারা যান। এ ঘটনার পর আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে ও বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক অগি্নসংযোগের ঘটনা ঘটে, যা পরে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। সরকার বিনা শর্তে ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ মামলা প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয়। মামলা প্রত্যাহারের পর দেশজুড়ে প্রাথমিক বিজয়ের আনন্দ-হিল্লোল বয়ে যায়। শেখ মুজিবসহ সব অভিযুক্ত মুক্তি লাভ করলে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ সালে শেখ মুজিবকে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় 'বঙ্গবন্ধু' উপাধিতে ভূষিত করে। এই মামলায় চট্টগ্রাম থেকে আমরা যারা অভিযুক্ত ছিলাম তাদের চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে প্রয়াত মন্ত্রী জহুর আহম্মদ চৌধুরীর নেতৃত্বে সংবর্ধনা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। মানিক চৌধুরী, বিধানকৃষ্ণ সেন এবং আমাকে বিপুল জনতার উপস্থিতিতে বিজয়মালায় অভিষিক্ত করা হয়।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা একটি অন্যতম মাইলফলক। স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে এ মামলার গুরুত্ব অপরিসীম। আগরতলা মামলাকে কেন্দ্র করে যেসব ঘটনা ঘটে সেগুলোই স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি অন্যতম স্রোতধারা।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে মুখ্য ভূমিকা পালনকারী হিসেবে অনেক রাজনৈতিক নেতার নাম উচ্চারিত হয়। কিন্তু আমার ভাবতে অবাক লাগে মানিক চৌধুরী ও বিধানকৃষ্ণ সেনসহ মামলার অভিযুক্ত অন্য বিপ্লবীদের আমরা কিভাবে ভুলে গেলাম।
মাহ্ফুজুল বারী, টরন্টো, কানাডা
কালের কন্ঠ 

মঙ্গলবার, ১ মার্চ, ২০১১

৩০তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে স্মরণসভায় অভিমত বাঙালির মুক্তিযুদ্ধে মানিক চৌধুরীর অবদান অসামান্য

জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ট সহচর আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম অভিযুক্ত মুক্তিযুদ্ধের বিশিষ্ট সংগঠক শ্রী ভূপতি ভূষণ চৌধুরী ওরফে মানিক চৌধুরীর ৩০তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে স্মরণসভা গত ৩০ জুন মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী হলে সাংস্কৃতিক সংগঠক মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সংরক্ষণ পরিষদের সদস্য সচিব যদু গোপাল বৈষ্ণব এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন প্রাক্তন সংসদ সদস্য, প্রবীণ রাজনীতিবিদ মো. ইছহাক মিয়া। বক্তব্য রাখেন মুহাম্মদ আশরাফ খান, বিশিষ্ট মানবাধিকার সংগঠক ও আইনজীবী রানা দাশগুপ্ত চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী, মুক্তিযোদ্ধা মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি নঈম উদ্দিন চৌধুরী, যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মাসুম চৌধুরী, সাংস্কৃতিক সংগঠক ডা. বিধান মিত্র, গণতন্ত্রী পার্টির মহানগর সহ-সভাপতি স্বপন সেন, চেতনা সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট চির্ম্মল শর্মা ও সন্দ্বীপনা সংস্কৃতিক ফোরামের মহাসচিব ভাস্কর ডি.কে দাশ মামুন। প্রধান অতিথি ইছহাক মিয়া বলেন, মানিক চৌধুরী ’৬২ থেকে ’৭১ পর্যনত্ম বাঙালির স্বাধীনতা অর্জনে যে অসামান্য ভূমিকা রেখেছেন তা জাতির ইতিহাসে চিরদিন স্বর্ণাক্ষরে লিখা থাকবে। আইনজীবী রানা দাশগুপ্ত বলেন, শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য মানিক চৌধুরীর ত্যাগের ইতিহাসকে এ প্রজন্মের ছেলেদেরকে জানাতে হবে তবেই স্বাধীনতার ইতিহাস পূর্ণাঙ্গ হবে।
সুপ্রভাত রাউজান
বিভূতি ভূষণ চৌধুরী প্রকাশ মানিক চৌধুরী ছিলেন রাজনীতির প্রবাদ প্রতিম ব্যক্তিত্ব। স্বাধীনতা সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ, আওয়ামী রাজনীতি, বঙ্গবন্ধুর সাহচর্য এবং বাংলার অর্থনৈতিক মুক্তিসহ প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামে কার্যক্রমে মানিক চৌধুরীর ছিল সক্রিয় অংশগ্রহণ ও গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। তার অনন্য অনস্বীকার্য অবদান জাতি কখনও ভুলতে পারে না। তাই চট্টগ্রামের এ মহান ব্যক্তিত্বকে জাতীয় বীর ঘোষণা দেয়া ও চট্টগ্রামের শাহ আমানত সংযোগ সেতু সড়কের নাম মানিক চৌধুরীর সড়ক নামকরণের দাবি চট্টলাবাসীর। সুপ্রভাত রাউজান’র উদ্যোগে আয়োজিত মানিক চৌধুরীর ৩০তম মৃত্যুবার্ষিকীর আলোচনায় বক্তারা একথা বলেন।
সুপ্রভাত রাউজান’র উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট কলনী দেব চৌধুরীর সভাপতিত্বে স্মরণ সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন নোয়াপাড়া ডিগ্রী কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ, বিজয় লক্ষী দেবী। বিশেষ অতিথি ছিলেন আরিফ চৌধুরী, ছাত্রনেতা বিপ্লব দাশগুপ্ত। খবর প্রেস বিজ্ঞপ্তির। 

সূত্রঃ দৈনিক আজাদী
 


রবিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১১

মুক্তিযুদ্ধে পটিয়া : খন্ডিত কিছু স্মৃতি

Tuesday, August 4, 2009

মুক্তিযুদ্ধে পটিয়া : খন্ডিত কিছু স্মৃতি

[মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ছোট ছিলাম বলে যুদ্ধে যাওয়া হয়নি। যুদ্ধে না গেলেও আজও কানে বাজে পাকিসত্মানী হানাদার বাহিনীর মেশিনগান-কামানের গোলার শব্দ, কানে বাজে হানাদারদের জঙ্গীবিমানের গর্জন, চোখে ভাসে পাকিস্তানী বর্বরতার দৃশ্য, স্মৃতিতে ভাসে মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাঁথা। শৈশবের সেই স্মৃতির মনিকোটা হতে হাতড়িয়ে বের করে আনা হয়েছে এই লেখাটি পরিসরের সংক্ষিপ্ততা ও ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে পটিয়ার মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত অনেক তথ্য ও অনেক মুক্তিযোদ্ধার নাম এই লেখায় উল্লেখ না থাকায় আমি আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি]
বাঙালি জাতির ইতিহাসে যে ক’টি বীরত্ব গাঁথা রয়েছে সে সবের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ বীরত্বগাঁথা ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ। পৃথিবীর খুব কম জাতি রয়েছে, যারা ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছে, স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধে যারা অকাতরে প্রাণ দিয়েছিলেন, তাঁদের সুবাদেই বাঙালি জাতি শত শত বছর পরাধীনতার শৃঙ্খলে থাকার পরও বীরের জাতিতে পরিণত হয়েছিল।
এই মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে বীর প্রসবিনী পটিয়া। বৃটিশ শাসনামল হতে শিক্ষা দীক্ষায় প্রাগ্রসর পটিয়া মুক্তিযুদ্ধের সময়ও ছিল অগ্রভাগে। বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা, বাংলাদেশের স্থপতি, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অন্যতম তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামী বিভূষি ভূষণ চৌধুরী প্রকাশ মানিক চৌধুরী ছিলেন পটিয়ার হাবিলাসদ্বীপ গ্রামের সূর্যসন্তান (এই সূর্য সন্তানের জন্য আমরাও গর্বিত)।
১৯৭০ সালের জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী অধ্যাপক নুরুল ইসলাম চৌধুরী ও সুলতান কুসুমপুরী বিজয়ী হওয়ার পর হতেই মূলত ঐতিহাসিক পটিয়া আন্দোলন সংগ্রামে মুখরিত হয়ে উঠে। আমার স্পষ্ট মনে আছে নির্বাচনে বিজয়ের পর আমাদের হুলাইন গ্রাম হতে বের করা একটি মিছিল বড়দের সাথে আমরা পিচ্ছিরাও সামিল হয়েছিলাম। যে মিছিলের শ্লোগান ছিল ‘‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’’, ‘‘সাত তারিখে জিতলো কে, নৌকা-নৌকা’’, ‘‘সতের তারিখ জিতলো কে, নৌকা-নৌকা’’, ‘‘ইয়াহিয়ার মুখে লাথি মারো পূর্ববাংলা স্বাধীন করো’’।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের সেই কালো রাতে যখন বর্বর পাকিস্তানী সেনাবাহিনী অপারেশন সার্চলাইটের নামে ঢাকায় নিরস্ত্র প্রতিরোধের পরিকল্পনা প্রণয়ন করা। ২৬ মার্চ চট্টগ্রাম (আগ্রাবাদ) বেতার কেন্দ্র হতে প্রথমে এম এ হান্নান ও পরে ২৭ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়া বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করলে পটিয়াবাসী তথা সারা দেশের মানুষ উজ্জীবিত হয়। সেদিন ঝাউতলা রেলস্টেশনসহ চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে বিহারী কর্তৃক বাঙালি নিধনের সংবাদেও পটিয়াবাসী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে শুরু করে। পটিয়ার জাতীয় পরিষদ সদস্য অধ্যাপক নুরুল ইলাম চৌধুরী, পূর্ণেন্দু দস্তিদার, চৌধুরী হারুনুর রশিদ, আবুল মাসুদ চৌধুরী, নুরুন্নবী, অধ্যক্ষ নুর মোহাম্মদ, শামসুদ্দিন আহমদ, নুরুল ইসলাম চৌধুরী, অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন দাশ, অধ্যাপক শামসুল ইসলামসহ আরও অনেকের নেতৃত্বে পটিয়াবাসী মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করে।
পটিয়ার সর্বস্তরের জনতা সেদিন পূর্ববাংলার স্বাধীনতার নেশায় উম্মাদ হয়ে উঠে। হাজার হাজার ছাত্র-জনতা ভারতে গিয়ে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়। অনেকে দেশের অভ্যন্তর থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করে। মুষ্ঠিমেয় কিছু স্বাধীনতা বিরোধী থাকলেও মূলত: পটিয়া ছিল স্বাধীনতাকামী মুক্তি পাগল জনতার দুর্ভেদ্য দূর্গ। সম্ভবত একমাত্র পটিয়া’ই ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত হানাদার মুক্ত তথা স্বাধীন ছিল।
পটিয়াবাসীর রাজনৈতিক সচেতনতা ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নেয়ার কথাটি বুঝতে পেরে যুদ্ধের প্রথমদিকেই পাকিস্তানী বিমানবাহিনী ১৪ এপ্রিল শুক্রবারে পটিয়া সদরে ব্যাপক বোমাবর্ষণ করে। সেদিন প্রায় অর্ধশতাধিক লোক শহীদ হন। যুদ্ধের শুরুতে পাকিস্তানী বাহিনীর এই বর্বরতা পটিয়াবাসীকে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে অনুপ্রেরণা জোগায়।
মুক্তিযুদ্ধে শুরুতে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠকারী মেজর জিয়াউর রহমান ও তৎকালীন পটিয়ার সন্তান ক্যাপ্টেন অলি আহমদ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র পতনের পর পটিয়ার হাবিলাসদ্বীপ ইউনিয়নের হুলাইন গ্রামের আমিন শরীফ চৌধুরী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিশ্রাম নিয়েছিলেন বলে জানা যায়। স্বাধীনতা যুদ্ধের বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ক্যাপ্টেন অলি আহমদ ‘বীর বিক্রম’ উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন। পটিয়ার বীর মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকদের মধ্যে অনেকের নাম আজ মনে না থাকলেও কিছু মুক্তিযোদ্ধার ও সংগঠকের নাম আজও স্মৃতিতে জ্বল জ্বল করছে। তাদের মধ্যে এডভোকেট জালালউদ্দিন আহমদ চৌধুরী, এস এম ইউসুপ, আহমদ শরীফ মনির, ধীরেন দাশ, মোহাম্মদ মহসিন, আহমদ নবী, মাহফুজুর রহমান খান, আবদুস ছালাম, শামসুদ্দিন আহমেদ, আবদুল বারিক, প্রফেসর শামসুল ইসলাম, নুরুল ইসলাম চৌধুরী, নাসিরুদ্দিন চৌধুরী, ফজল আহমদ চৌধুরী, দীলিপ কান্তি দাশ, শাহ আলম, অনিল নালা, আবুল কাশেম, ফজলুল হক, আবদুস শুক্কুর, আবু তাহের বাঙালি, মুক্তিমান বড়ুয়া, মাওলানা এমদাদ, ফজল আহমদ, নূর মোহাম্মদ, শহীদ সুবেদার আবদুস ছালাম, মরহুম মোজাহেরুল হক, আ.জ.ম. সাদেক, কাজী আবু তৈয়ব, মহিউদ্দিন, একেএম আবদুল মতিন, প্রদ্যুৎ পাল, চৌধুরী মাহবুব, ইউসুপ খান, শিরু বাঙালি, আবদুস ছবুর, মোহাম্মদ আসলাম, মো: রফিক খান, রফিক আহমদ, ফেরদৌস চৌধুরী, আবু তাহের, সোলেমান কমান্ডার, সোলায়মান খান, আবদুল হক, স্বপন চৌধুরী, আবুল হাশেম মাস্টার প্রমুখের নাম উল্লেখ্যযোগ্য।
চট্টগ্রামের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ক্যাপ্টেন করিমের নাম অবিস্মরণীয় হয়ে আছে। তিনি পটিয়ার অধিবাসী না হলেও মুক্তিযোদ্ধাদের শ্রদ্ধার নাম ছিলেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে তিনি বিজয়ের পূর্ব মুহূর্তে শহীদ হয়েছিলেন। বিনিনেহারার ডা. শামসুল আলম ও গৈড়লার আহমদ হোসেন মাস্টার মুক্তিযোদ্ধাদের যাবতীয় সহায়তা করতেন বলে জানা যায়। এ দু’জনের বাড়ি মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাঁটি হিসেবে সুপরিচিত ছিল।
পটিয়ার মুক্তিযুদ্ধে মিলিটারী পুলের পাক বাহিনীর সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মুখ যুদ্ধের কথা মনে হলে আজও গা শিউরে উঠে। সেপ্টেম্বর সংঘটিত এই যুদ্ধে উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন হতাহত হয়েছিলেন। পাকিসত্মানীদের অত্যাধুনিক অস্ত্রের আক্রমনের মুখে পেরে না উঠে মুক্তিযোদ্ধাদের শেষ পর্যমত্ম পিছু হটেছিলেন, সে যুদ্ধে হুলাইনের সোলেমান কমান্ডার, সোলায়মান খানসহ ১৫ জন মুক্তিযোদ্ধা অংশ নিয়েছিলেন। যুদ্ধের পর পাকিস্তানী বাহিনী ক্রোধান্বিত হয়ে পুরো সেনেরহাট জ্বালিয়ে দেয় এবং হাবিলাসদ্বীপ গ্রামের শত শত হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ঘর বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়। সেদিন হানাদার বাহিনীর সাথে দেশীয় অনেক রাজাকারও অংশ নিয়েছিল বলে জানা যায়। সেদিন চরকানাই ফুলতলে হুলাইনের শামসুল আলম পাকিস্তান বাহিনীর হাতে শহীদ হন।
পটিয়ার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে মোজাফফরাবাদ হত্যাকান্ড বেদনার স্মৃতি হিসেবে আজীবন সকলের মনে থাকবে। পাকিস্তানী আর্মি মোজাফফরাবাদে সেদিন শতাধিক বাড়ি জ্বালিয়ে দেয় এবং অর্ধশতাধিক হিন্দু ধর্মাবলম্বী লোককে হত্যা করেছিল। পটিয়ার মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় স্মৃতি হয়ে আছে ধলঘাট, গৈড়লার টেক ও জিরি মাদ্রাসার যুদ্ধ। যে যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের পাক হানাদার বাহিনী ও রাজাকারদের সন্ত্রস্থ করতে পেরেছিলেন। পটিয়ার মুক্তিযোদ্ধারা খাসমহল আক্রমন করে জ্বালিয়ে দিয়েছিল। আক্রমন করেছিলেন লাখেরার ওয়্যারলেস সেন্টার। মনসার টেকে রাজাকার কর্তৃক স্বাধীনতাকামী নিরীহ মানুষকে হত্যার ঘটনা যুদ্ধের বেদনাবহ স্মৃতির অন্যতম।
মুক্তিযুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ের একদিন সকালে হুলাইন গ্রামের মানুষ হতচকিয়ে গিয়েছিল। কেননা এর আগের দিন রাত্রে গ্রামের প্রায় কয়েক’শ কিশোর-তরুণ একযোগে যুদ্ধে অংশ নেয়ার উদ্দেশ্যে প্রশিক্ষণের জন্য ভারতের উদ্দেশ্যে গ্রাম ছেড়েছিল। এতগুলো ছেলের একযোগে গ্রাম ত্যাগে পুরো গ্রাম জুড়ে কান্নার রোল উঠেছিল। যাকে ঐতিহাসিক ঘটনা বলে চিহ্নিত করা যায়। সেদিন যারা যুদ্ধে যাওয়ার জন্য বেরিয়ে ছিল তাদের মধ্যে নুরুল হাকিম, মরহুম কিবরিয়া, ইউসুপ খান, মরহুম হারুনুর রশিদ, সাইফুল্লাহ রফিক, আনোয়ারুল ইসলাম, হারুন খান, নুরু, সোলায়মান খান প্রমুখের নাম এখনও মনে আছে। সেদিন তাদের সাথে আমার অগ্রজ মরহুম শফি খানও চলে গিয়েছিলেন। দুর্ভাগ্যজনক সত্য হলো তাদের অনেকেই মুক্তিযোদ্ধার সনদপত্র যোগার করতে পারেনি।
হুলাইন গ্রামের তৎকালীন ছাত্রলীগের সদস্য মুজিবুর রহমান খান (বর্তমানে এডভোকেট) সেদিন মুক্তিযোদ্ধাদের ইনফরমার তথা সহায়তাকারী হিসেবে কাজ করেছিলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সর্বতোভাবে সহায়তা করতেন মরহুম আ.জ.ম. নুরুল আলম মাস্টার, মোজাফফর আহমদ, নেছার আহমদ চৌধুরী, জাফর আহমদ চৌধুরী ও মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী প্রমুখ।
মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে একজন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার সেবাশুশ্রুষা করার আমার নিজেরও হয়েছিল। বাবার সাথে পরিচয়ের সুবাদে পার্শ্ববর্তী বোয়ালখালী থানার খিতাপচর গ্রামের আলতাফ নামের একজন ইপিআর সদস্য মুক্তিযোদ্ধা পার্বত্য অঞ্চলে সম্মুখ যুদ্ধে গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন। পরবর্তীতে তাঁকে গোপনে চিকিৎসা দিয়ে কিছুটা সুস্থ হলে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু নিজ বাড়িতে তিনি নিরাপদ না হওয়ায় বাবা তাঁকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসেন। আমাদের নির্মাণাধীন মাটির দালানের দোতলায় তিনি থাকতেন। সেখানেই তার খাওয়া দাওয়া হতো। রাত্রে তিনি আমাদেরকে নিয়ে অল্পক্ষণের জন্য বের হতেন। সে সময় তার কাছে মুক্তিযুদ্ধের অনেক গল্প শুনতাম (জানি না আজ কোথায়)। তিনি প্রায় ২০ দিন থাকার পর সুস্থ হয়ে চলে গিয়েছিলেন।
১৬ ডিসেম্বর যখন পাকিসত্মানী বাহিনী রেসকোর্স ময়দানে মুক্তি ও মিত্রবাহিনীর প্রধান জগজিৎ সিং অরোরার নিকট আত্মসমর্পণ করে, তখন সারাদেশের মতো পটিয়াতেও আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। পটিয়ার সর্বত্র বিজয় দিবস উদযাপিত হয়। বিজয় দিবস উদযাপনের অংশ হিসেবে ১৭ ডিসেম্বর আমাদের এলাকায় হাবিলাসদ্বীপ হাই স্কুলের মাঠে মুক্তিযোদ্ধারা বিজয় দিবস উদযাপন করেন। তিনটি এলএমজির সাহায্যে ফাঁকা গুলি ছুড়ে সেদিন উৎসবের সূচনা করা হয়েছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের ‘জয় বাংলা’, ‘তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনা’, ‘জেলের তালা ভাঙ্গবো শেখ মুজিবকে আনবো’ ইত্যাদি শ্লোগানে মুখরিত হয়েছিল সারা গ্রাম। সেদিন বোয়ালখালী হতে গ্রেফতারকৃত ১৭ জন পাকিসত্মানী সৈন্যকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল, যাদেরকে মুক্তিযোদ্ধারা গ্রেফতার করে নিয়ে এসেছিলেন। (লেখক: মুহাম্মদ মুসা খান) 

 সূত্রঃ পটিয়া ওয়েব

আগরতলা মামলার ৪২ বছর

মুহাম্মদ শামসুল হক
(শেষাংশ)
শেখ মুজিব যে স্বাধীনতার জন্য ষাটের দশকের শুরু থেকে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তার সত্যতা ১৯৬২ সালেই পূর্ব পাকিস্তান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৈরি এক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, 'পূর্ব পাকিস্তান লিবারেল পার্টির নামে যারা প্রচারপত্র বিলি করেন, তাদের একজনকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তিনি কলকাতায় গিয়ে সেখানে কয়েক ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাত করলেও তাঁর কথায় প্রকাশ হয় যে, পোস্টারগুলো (প্রচারপত্র) আওয়ামী লীগের একজন প্রাক্তন মন্ত্রী, একজন অধ্যাপক ও অন্যান্য স্থানীয় লোকজনের অনুরোধে প্রস্তুত করা হয়। সে প্রচারপত্রে নিজস্ব সেনা ও নৌবাহিনী সমেত স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রস্তাব করা হয় এবং তাতে কোন্ কোন্ ব্যক্তি শীর্ষস্থানীয় পদে আসীন হবেন তার তালিকাসহ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও সোভিয়েত ইউনিয়নের কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হয়। তা পেশোয়ারে নিয়োজিত একজন বিক্ষুব্ধ, অসন্তুষ্ট, পূর্ব পাকিস্তানী এয়ারম্যানের কাজ বলে প্রতীয়মান হয়।' তৎকালীন ছাত্রনেতা আবদুর রাজ্জাক (সাবেক মন্ত্রী ও এমপি) আমাকে (লেখক) দেয়া সাক্ষাতকারে জানিয়েছেন ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় এ রকম একটি প্রচারপত্র তিনিসহ কয়েকজন ছাত্র বিলি করেছেন।
ভয়েস অব আমেরিকাকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে (২০০৯ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে প্রচারিত) বঙ্গবন্ধুর বড় মেয়ে ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ষাটের দশকের শুরম্ন থেকে বাংলাদেশকে স্বাধীন করার একটা প্রস্তুতি বঙ্গবন্ধু শুরু করেছিলেন। যে কেন কারণে হোক সেটা সফল হয়নি।
৯৪ সালের ১০ আগস্ট লেখা ও সংবাদপত্রে প্রকাশিত এক নিবন্ধ শেখ হাসিনা লিখেছেন 'তখন রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিল। আওয়ামী লীগের সব নেতা 'এবডো' ছিলেন অর্থাৎ সক্রিয় রাজনীতিতে কেউ অংশ গ্রহণ করতে পারবেন না। তাই ছাত্রদের সংগঠিত করে আইয়ুববিরোধী আন্দোলন শুরু করা হয়। আব্বা অবশ্য আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধবদের বাড়ি বেড়াতে যেতেন বিভিন্ন জেলায়। সেখানে দলকে সংগঠিত করার কাজ ও আইয়ুববিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলার প্রস্তুতি নিতে থাকেন। বাংলাদেশকে স্বাধীন করার জন্য প্রতি জেলা, মহকুমা, থানায় গোপন সেল গঠন করেন। দেশকে স্বাধীন করার জন্য দলকে সুসংগঠিত করার কাজ গোপনে চলতে থাকে। ছাত্র আন্দোলন গড়ে ওঠে। ৬২তে বহু ছাত্র গ্রেফতার হয়। ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের বহু নেতা এ বাড়িতে এসেছেন গোপনে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ নিতে ও আলোচনা করতে।'
দেশকে স্বাধীন করার গোপন প্রস্তুতিমূলক প্রক্রিয়ায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত সামরিক বাহিনীর সাবেক সদস্য, সরকারী আমলা ও রাজনৈতিক নেতাদের অনেকেও পৃথক সাক্ষাতকারে সশস্ত্র প্রস্তুতির বিষয় আমার কাছে স্বীকার করেছেন। ইতোমধ্যে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামিদের মধ্যে যাঁরা এখনও জীবিত আছেন তাঁদের মধ্যে খান শামসুর রহমান সিএসপি, ব্রিগেডিয়ার (অব) খুরশিদ উদ্দিন, কর্নেল (অব) শওকত আলী (বর্তমানে ডেপুটি স্পীকার), কর্নেল (অব) শামসুল আলম, কমান্ডার (অব) আবদুর রউফ, নূর মোহাম্মদ বাবুল, (ক্যাপ্টেন বাবুল), করপোরাল এবিএম সামাদ, ফ্লাইট সার্জেন্ট আবদুল জলিল, মাহফুজুল বারী, ডা. ছৈয়দুর রহমান (রাজসাক্ষী), বিধান কৃষ্ণ সেন ও বৈরী সাক্ষী আবুল হোসেনের সাক্ষাতকার নিয়েছি। এ ছাড়া নিয়েছি আসামি লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেনের স্ত্রী কোহিনুর বেগম, রুহুল কুদ্দুসের ছেলে এহসান উল-আমিন, প্রয়াত মানিক চৌধুরীর স্ত্রী সবিতা চৌধুরী ও ছেলে দীপংকর চৌধুরী, সুবেদার আবদুর রাজ্জাকের স্ত্রী রিজিয়া বেগম ও ছেলে এসএম তরিকুল ইসলাম, আলী রেজার ভাই আলী নওয়াজ, সুলতান উদ্দিনের ভাই কামালউদ্দিন, ঘটনার সঙ্গে যুক্ত কিন্তু চার্জশীটভুক্ত হননি এমন ব্যক্তি সাবেক সেনা প্রধান লে. জে. মাহবুবুর রহমান, আসামি না হয়েও ১৪ মাস জেলখাটা জয়নাল আবেদীন খান, স্বাধীন বাংলা নিউক্লিয়াসের অন্যতম সংগঠক প্রয়াত জাসদ নেতা কাজী আরেফ আহমদ, আওয়ামী লীগ নেতা আবদুর রাজ্জাক, অধ্যাপক সৈয়দ ইলিয়াছ ধামী প্রমুখের সাক্ষাতকার। তাঁদের সঙ্গে কথা বলে এটা নিশ্চিত হওয়া গেছে পশ্চিম পাকিস্তানে তৎকালীন সশস্ত্র বাহিনীর বিভিন্ন বিভাগে কর্মরত কর্মকর্তা কর্মচারীরা পাকিস্তানী কর্মকর্তাদের হাতে প্রতিনিয়ত নির্যাতিত, লাঞ্ছিত, অবহেলিত, কথায় কথায় চাকরিচু্যতি, ছুটিছাঁটা বা পদোন্নতিতে বৈষম্য ইত্যাদির শিকার হচ্ছিলেন। তাঁদের মধ্যে কিছু স্বাধীনচেতা, প্রতিবাদীমনস্ক বাঙালী সামরিক-বেসামরিক ব্যক্তি এসব অন্যায় আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। তাঁরা বিক্ষিপ্তভাবে চিন্তা করতে থাকেন কীভাবে পাকিস্তানীদের অত্যাচার থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। কেউ কেউ এমনও ভাবেন যে এই অত্যাচার ও বৈষম্যের হাত থেকে বাঁচতে হলে পূর্ব বাংলাকে পশ্চিমাদের শাসনের কবল থেকে মুক্ত অর্থাৎ স্বাধীন করতে হবে। এমনকি সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে হলেও কিন্তু অল্প কয়েকজন সৈনিক বা ব্যক্তি চাইলেই তো আর স্বাধীনতা এসে যাবে না। এজন্য প্রয়োজন সাংগঠনিক শক্তি, রাজনৈতিক শক্তির সমর্থন ও সহযোগিতা এবং আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা। এ পর্যায়ে তাঁরা প্রাথমিকভাবে পাঁচ-সাতজন আলাপ আলোচনার মাধ্যমে তৎকালীন বাঙালীদের মধ্য থেকে এমন সাহসী ও যোগ্য নেতার খোঁজ করতে থাকেন যিনি সশস্ত্র প্রস্তুতির গোপন তৎপরতাসহ রাজনৈতিক সমর্থক প্রয়োজনীয় সব রকম সাহায্য সহযোগিতা দিতে পারবেন। নানা সূত্রের মাধ্যমে তাঁরা বেশ ক'জন জ্যেষ্ঠ নেতার সমর্থন চেয়ে ব্যর্থ হন। একপর্যায়ে নিশ্চিত হন যে, শেখ মুজিবই হতে পারেন তাঁদের কাঙ্কিত সাহসী, প্রতিবাদী, উপযুক্ত সংগ্রামী নেতা।
শেখ মুজিব ইতোমধ্যে অর্থাৎ '৬১ সালেই 'পূর্ব বাংলা মুক্তিফ্রন্ট' নামে একটি গোপন সংগঠনের জন্ম দেন। পাশাপাশি চলে ছাত্রদের মধ্যে সশস্ত্র ক্যাডার সৃষ্টির প্রক্রিয়া। এর অংশ হিসেবেই বঙ্গবন্ধুর তত্ত্বাবধানে ছাত্রলীগের বাছাই করা স্বাধীনতাপন্থী প্রগতিশীল বিশ্বস্ত কর্মীদের নিয়ে '৬২ সালে গঠন করা হয় 'স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ।' ১৯৬৪ সালে গঠন করা হয় স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদের 'কেন্দ্রীয় নিউক্লিয়াস'। শুরুতে এসব সংগঠনের নেতৃত্বে যুক্ত ছিলেন সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক ও কাজী আরেফ আহমদ।
ষাটের দশকের গোড়ার দিকে পশ্চিম পাকিস্তানে অবস্থানরত নৌবাহিনীর বিক্ষুব্ধ লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেমের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর পরোক্ষ যোগাযোগ শুরু হয়। '৬২ সালের শেষের দিকে করাচীতে নৌবাহিনীর কামাল উদ্দিনের টিচার্স হাউজিং সোসাইটির বাসায় এক গোপন বৈঠকে নৌবাহিনীর সদস্যরা তাঁদের মনোভাবের কথা শেখ মুজিবকে খুলে বলেন এবং তাঁর নেতৃত্ব ও পরামর্শসহ সার্বিক সাহায্য সহযোগিতা চান। ওই বৈঠকে বিক্ষুব্ধ সৈনিকদের পক্ষে তাঁদের গ্রুপ নেতা মোয়াজ্জেম হোসেন, মোজাম্মেল হোসেন, সুলতান উদ্দিন, স্টুয়ার্ড মুজিব, নূর মোহাম্মদ বাবুল (নূর মোহাম্মদ বাবুল, গোয়াল চামট, ফরিদপুর এখনও জীবিত) প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। শেখ মুজিব তাঁদের মনোভাব জেনে নিজেরও একই মনোভাব ও পরিকল্পনার কথা জানান। তিনি বলেন, 'স্বাধীনতার জন্য আমি আমার শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত দিতে রাজি আছি। আপনাদের যখন যে রকম সাহায্য সহযোগিতা প্রয়োজন তা আমি দেব।' এ ছাড়া স্বাধীনতার আন্দোলনকে রাজনৈতিকভাবে জনপ্রিয় করার ব্যাপারে ছাত্রদের দায়িত্ব দেয়া হবে বলে তিনি তাঁদের আশ্বস্ত করেন। একই সঙ্গে তিনি দেশপ্রেমিক সৈনিকদের সুসংগঠিত হওয়ার পরামর্শ দেন। তার আগে অর্থাৎ লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেমের প্রাথমিক যোগাযোগের পর বঙ্গবন্ধু রুহুল কুদ্দুসসহ কয়েকজন অতি বিশ্বস্ত লোক নিয়ে বিষয়টি পর্যালোচনা করে চূড়ান্তা সিদ্ধান্ত নেন। সমস্ত বিষয়ে সর্বোচ্চ গোপনীয়তা বজায় রাখার সিদ্ধান্ত হয়। এরপর থেকে নৌ, বিমান ও সেনা সদস্যরা তাঁদের বিশ্বস্ত লোকজন নিয়ে ধীরে ধীরে পৃথক পৃথক গ্রুপ সৃষ্টির মাধ্যমে সংগঠিত হতে থাকেন। ১৯৬৬ সালের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন গ্রুপের নেতা ও সদস্যরা করাচীতে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর বাসভবন, লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেমের করাচী ও চট্টগ্রামের নেভাল এ্যাভিনিউর বাসা, কামাল উদ্দিনের বাসা, আহমদ ফজলুর রহমান ও রুহুল কুদ্দুসের বাসা, ঢাকায় তাজউদ্দীন আহমদের বাসা, চট্টগ্রামে ভূপতিভূতিভূষণ চৌধুরী (মানিক চৌধুরী)র রামজয় মহাজন লেন, ডা. ছৈয়দুর রহমানের এনায়েত বাজার আউটার হাউস এবং বিধান সেনের মিরেন্ডা লেনের বাসা, হোটেল মিসকা, হোটেল শাহজাহান, পাঁচলাইশের পিআইএ হাউসসহ বিভিন্ন স্থানে একাধিক বৈঠকে মিলিত হন। বেশ কটি বৈঠকে বঙ্গবন্ধু সরাসরি উপস্থিত ছিলেন। তবে নিরাপত্তা, গোপনীয়তা ইত্যাদি বিষয় বিবেচনা করে বঙ্গবন্ধু কেবল নির্দিষ্ট কয়েকজন ছাড়া অন্যদের সঙ্গে সাক্ষাত দিতেন না। এমনকি আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগ-যুবলীগের তৎকালীন নেতৃত্বকে পর্যন্ত এই গোপন প্রক্রিয়ার কথা জানানো বারণ ছিল। কারণ কোনো কারণে ঘটনা ফাঁস হলে সবাইকে ফাঁসিতে ঝুলতে হবে এবং বাঙালীদের মুক্তি আন্দোলন অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে। বিপ্লবী সংগঠনের সূচনাকালীন ও গোপন বিপ্লবী কাউন্সিলের একমাত্র জীবিত সদস্য নূর মোহাম্মদ বাবুল জানিয়েছেন ১৯৬৬ সালে ছয় দফা ঘোষণার পর করাচীতে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর বাসভবনের সামনে ট্যাক্সি দুর্ঘটনার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু তা সফল হয়নি। বঙ্গবন্ধু তাঁর পক্ষে সৈনিকদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য চট্টগ্রামের মানিক চৌধুরীকে মনোনীত করেন। পরে ডা. ছৈয়দুর রহমান ও বিধান কৃষ্ণ সেনকেও নির্বাচিত করা হয়। বঙ্গবন্ধু তাঁর বিশ্বস্ত বেশ কয়েকজন সিএসপি কর্মকর্তা যেমন রুহুল কুদ্দুস, আহমদ ফজলুর রহমান, খান শামসুর রহমান প্রমুখের সঙ্গেও স্বাধীনতা অর্জনের প্রয়োজন এবং সৈনিকদের সহযোগিতার ব্যাপারে আলোচনা করতেন। মানিক চৌধুরী শেখ মুজিবের পক্ষে অনেক সময় খবরাখবর জানাতেন বেগম মুজিবকে।
বঙ্গবন্ধুর পরামর্শ অনুযায়ী কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেনের নেতৃত্বাধীন সৈনিক গ্রুপের সঙ্গে সিএসপি কর্মকর্তাদেরও একাধিক বৈঠক হয় করাচী, ঢাকা ও চট্টগ্রামে। সংশ্লিষ্ট সবাই স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রস্তুতির কথা জানলেও এর বাস্তবায়নের প্রকৃত কৌশল সম্পর্কে সবাই পুরোপুরি জানতেন না। সংশ্লিষ্ট বেশিরভাগই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কথাবার্তা ও তাঁর কার্যক্রমে বুঝতে পেরেছিলেন যে, তাঁর মূল (বঙ্গবন্ধুর) লক্ষ্য ছিল, সকল প্রগতিশীল স্বাধীনচেতা শক্তির সম্মিলন ঘটিয়ে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে স্বাধীনতার পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টি করা। তবে এ পর্যায়ে সরকারের দিক থেকে সশস্ত্রভাবে বাধাবিঘ্ন এলে সশস্ত্র উপায়েই তা মোকাবেলার মাধ্যমে দেশকে স্বাধীন করার প্রস্তুতি নিতে হবে।
কিন্তু চারদিকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শেষ হওয়ার আগেই নানা কারণে পাকিস্তানী গোয়েন্দা সংস্থার কাছে বিষয়টি ফাঁস হয়ে যায়। মামলা চূড়ান্ত করার আগেই শেখ মুজিবকে জেলে আটক রাখা হয়। পরে একে একে গোপন প্রক্রিয়ায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত তিন হাজারের (কারও মতে ৪ থেকে ৫ হাজার) বেশি লোককে গ্রেফতার করা হয়। এর মধ্যে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত হিসেবে চিহ্নিত ৩৫ জনকে চার্জশীটভুক্ত আসামি এবং ১১ জনকে রাজসাক্ষী করে 'রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য' শিরোনামে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দায়ের করা হয়, যা 'আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা' নামে পরিচিতি পায়। ১৯৬৮ সালের ১৯ জুন শুরু হওয়া এই মামলায় মোট ২০০ সামরিক বেসামরিক ব্যক্তিকে সাক্ষী হিসেবে দেখানো হয়। চার জন সাক্ষী মামলার জেরাকালে অভিযোগ অস্বীকার করলে বৈরী ঘোষণা করা হয় তাঁদের। মামলার প্রধান অর্থাৎ এক নম্বর আসামি ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান এবং দুই নম্বর আসামি ছিলেন লে. ক. মোয়াজ্জেম হোসেন।
আগরতলা মামলায় মাত্র ৩৫ জনকে আসামি করা হলেও এতে বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে সরাসরি যুক্ত এবং তাঁদের নানাভাবে সহযোগী হিসেবে জড়িত সদস্য সংখ্যা পাঁচ হাজারের ওপরে হবে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন। তাঁদের অনেকে বিনা বিচারে এক থেকে দেড় বছর জেল খেটেছেন, নির্যাতন ভোগ করেছেন। কিন্তু মামলায় অভিযুক্ত করার মতো পর্যাপ্ত সাক্ষী প্রমাণের অভাবে তাঁদেরকে আসামি হিসেবে দেখানো হয়নি এবং অভিযোগপত্রও সেভাবে দেয়া হয়নি। শেষ পর্যন্ত মামলা প্রত্যাহার করা হলে সংশ্লিষ্ট সবাই জেল থেকে মুক্তি পান।
সংশ্লিষ্টদের কাছে জানা গেছে, প্রথম দিকে চার পাঁচজন করে এক একটা গ্রুপ বিপ্লবী প্রক্রিয়ায় যাত্রা শুরু করলেও ঘটনা ফাঁস হওয়ার আগে পর্যন্ত বিভিন্ন গ্রম্নপের সংস্পর্শে এসে পাঁচ হাজারের বেশি সামরিক ও বেসামরিক ব্যক্তি তাঁদের সদস্য হয়েছিলেন। এঁদের মধ্যে রয়েছেন প্রাক্তন সেনাপ্রধান লে. জে. মাহবুবুর রহমান, আসামি আলী রেজার ভাই আলী নওয়াজ এবং আসামির তালিকাভুক্ত না হয়েও ১৪ মাস জেল খাটা জয়নাল আবেদীন খান। এ ছাড়া অভিযোগপত্র পর্যালোচনায়ও দেখা যায়, অভিযুক্তদের সঙ্গে বিভিন্ন বৈঠকে এমন অনেকেই উপস্থিত ছিলেন যাঁদের নাম পরিচয় তদন্তকারীরা উদ্ধার করতে পারেনি।
বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ভারতের সহযোগিতায় সংশ্লিষ্টরা বাংলাদেশকে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন তথা স্বাধীন করতে চায় এমন স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য পাকিস্তানী সেনা কর্মকর্তারা গ্রেফতারকৃতদের ওপর সীমাহীন নির্যাতন চালায়। ভারতের সহায়তায় পাকিস্তান ভাঙার ষড়যন্ত্রের কথা শুনে পূর্ব বাংলার মানুষ শেখ মুজিবসহ স্বাধীনতাকামীদের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠবে এবং এতে শেখ মুজিবকে ফাঁসিতে ঝোলানোর মাধ্যমে স্বাধীনতা আন্দোলন চিরতরে সত্মব্ধ করে দেয়া যাবে এই ধারণা থেকে সরকার মামলাটিকে 'আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা' হিসেবে প্রচার করে। কিন্তু বাঙালীরা সরকারের ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেন শেখ মুজিবসহ সবার নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে ব্যাপক গণআন্দোলনের মাধ্যমে। অবশেষে গণবিস্ফোরণের মুখে উপায়ান্তর না দেখে সরকার মামলা প্রত্যাহারে বাধ্য হয় এবং বঙ্গবন্ধুসহ সব বন্দী '৬৯-এর ২২ ফেব্রুয়ারি জেল থেকে মুক্তি পান। মুক্তির পর ২৩ ফেব্রুয়ারি ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ আহূত সমাবেশেই শেখ মুজিব বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত হন।
স্বাধীনতা সংগ্রামীদের কার্যক্রমের জন্য যে টাকা পয়সার দরকার তা নানা উৎস থেকে পাওয়া যেত। এসব উৎস মূলত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আগ্রহেই সৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম উৎস ছিলেন চট্টগ্রামের মানিক চৌধুরী (চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন কোষাধ্যক্ষ)।
আগরতলা মামলা পাকিস্তানের কাছে ষড়যন্ত্রমূলক মনে হলেও বাঙালীদের কাছে তা ষড়যন্ত্রমূলক কর্মকা- হিসেবে কিছুতেই গণ্য হতে পারে না। বরং এটা ছিল বাংলাদেশকে স্বাধীন করার লক্ষ্যে বাঙালীদের সংগ্রামী যাত্রাপথের একটি গৌরবময় অধ্যায়। এই মামলার মাধ্যমে পাকিস্তানীরা বঙ্গবন্ধুসহ শীর্ষস্থানীয় বাঙালী সামরিক বেসামরিক লোকদের হত্যা করতে চেয়েছিল ঠিকই। কিন্তু এই মামলাকে কেন্দ্র করেই ১৯৬৯-এ যে গণআন্দোলনের সূচনা হয় তার ফলে শাসকগোষ্ঠী সব আসামিকে মুক্তি দিয়ে মামলা প্রত্যাহারে বাধ্য হয়। অপরদিকে এই মামলার কার্যক্রম ও ঘটনাবলী বাঙালীদের আর গোপনে নয়, প্রকাশ্যে স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতার দাবি তুলতে উদ্বুদ্ধ করে। এ ধারাবাহিকতাই বাঙালীর গণজাগরণের ফলে '৭০-এর নির্বাচনে জনগণ বঙ্গবন্ধুর দল আওয়ামী লীগকে নিরঙ্কুশ রায় দেয়। এই রায় মেনে নিতে শাসকগোষ্ঠী অস্বীকার করায় মানুষ প্রকাশ্যেই স্বাধীনতার দাবিকে সামনে আনে, যার পরিণতি '৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ ও চূড়ান্ত পর্যায়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা। (সমাপ্ত)

লেখক : 'স্বাধীনতার সশস্ত্র প্রস্তুতি-আগরতলা মামলার অপ্রকাশিত জবানবন্দি' গ্রন্থের লেখক ও সাংবাদিক 

অপারেশন মার্চ লাইটের অন্যতম টার্গেট ছিলেন নৌবাহিনীর লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন


পটিয়ায় ব্রিটিশবিরোধী ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের বীরদের স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধন

পটিয়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি | তারিখ: ০৯-০৫-২০১০




চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার হাবিলাসদ্বীপে গত শুক্রবার ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, বায়ান্নর ভাষা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের বীরদের স্মরণে নির্মাণ করা স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধন করা হয়েছে।
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে শহীদ মাস্টারদা সূর্যসেনের সহযোদ্ধা বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরী এ স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধন করেন। এখানে ৫২-এর ভাষা আন্দোলন ও ’৭১-এর শহীদ, বীরকন্যা প্রীতিলতা ও কল্পনা দত্ত যোশী, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক মানিক চৌধুরী, কমরেড ধীরেন দাশ এবং মাস্টারদা সূর্যসেনের সহযোদ্ধা কিরণ সেন, হিমাংশু চক্রবর্তী, ফণী চৌধুরী, অমর দাশের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে।
হাবিলাসদ্বীপ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার বাস্তবায়ন পরিষদের উদ্যোগে এখানে সভা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন মুক্তিযোদ্ধা গৌরাঙ্গ নন্দী। এতে হরিসাধন দেবব্রহ্মণ, মানিক চৌধুরীর ছেলে দীপংকর চৌধুরী, কানাই লাল দাশ, পঞ্চানন চক্রবর্তী, নুরুল আরশাদ চৌধুরী, পুলক বিকাশ চৌধুরী, সিপিবির নেতা মাস্টার শ্যামল দে প্রমুখ বক্তব্য দেন

সূত্রঃ দৈনিক আজাদী

সোনার ছেলের সোনার দেশ বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ

সোমবার, ২৬ এপ্রিল ২০১০  সিদ্দিক হোসেন চৌধুরী : (গত সংখ্যার পর) ৯.প্রাক্তন হাবিলদার দলিল উদ্দিন পিতা: মি. আফিজুদ্দিন গ্রাম: শ্যামপুর, থানা: বাকেরগঞ্জ, জেলা: বরিশাল ৷ ১০. িম. রুহুল কুদ্দুস সি এস পি পিতা: মি. রইসউদ্দিন আহমেদ গ্রাম: পাঁচরিখি, থানা: সাতক্ষীরা, জেলা: খুলনা ৷ ১১. পাক/৭২৮৭০ ফ্লাইট সার্জেন্ট মোঃ ফজলুল হক পিতা: মৌঃ সৈয়দ আলী তালুকদার গ্রাম: সায়েস্তাবাদ, জেলা: বরিশাল ৷ ১২. মিঃ ভূপতি ভূষণ চৌধুরী ওরফে মানিক চৌধুরী পিতা: মি. ধীরেন্দ্রলাল চৌধুরী গ্রাম: হাবিলাল দ্বীপ, থানা: পটিয়া, জেলা: চট্টগ্রাম এবং রমজয় মোহন লেন কোতয়ালী, চট্টগ্রাম ৷ ১৩. মি. বিধানকৃষ্ণ সেন পিতা: মি. রাজেন্দ্র নারায়ণ সেন গ্রাম: সারোয়াতলা, থানা: বোয়ালখালী, জেলা: চট্টগ্রাম ৷ ১৪. পি জে. ও ২০৬৮ সুবেদার আবদুর রাজ্জাক পিতা: মি. সিতু সরকার গ্রাম: দক্ষিণ বরোষারচর, থানা: মতলব, জেলা: কুমিল্লা ৷ ১৫. প্রাক্তন হাবিলদার/ক্লার্ক মুজিবুর রহমান ইপিআরপিসি পিতা: মি. আবদুর রহমান গ্রাম: গোপালপুর, থানা: নবীনগর, জেলা: কুমিল্লা ৷ ১৬. প্রাক্তন ফ্লাইট সার্জেন্ট মোঃ আবদুর রাজ্জাক পিতা: মি. মুন্সী আসকার আলী গ্রাম: বান্ধারামপুর, থানা: দাউদকান্দি, জেলা: কুমিল্লা ১৭. পাক/৭২৩২৪ সার্জেন্ট জহুরুল হক পিতা: মি. কাজী মুজিবুর হক গ্রাম: সোনাপুর, থানা: সুধারাম, জেলা: নোয়াখালী ৷ ১৮. প্রাক্তন এ/বি মোঃ খুরশীদ পিতা: মি. আবদুল জব্বার সারের কাটেন কোতোয়ালী ফরিদপুর ৷ ১৯. মিঃ খান মোহাম্মদ শামসুর রহমান সিএসপি পিতা: মি. ইমতিয়াজউদ্দিন খান গ্রাম: লামবাড়ী, থানা: মানিকগঞ্জ, জেলা: ঢাকা ৷ ২০. পি জে ও ৭৬৮ রিসালাদার এ, কে, এম শামসুল হক এ. িস পিতা: মি. আবদুস সামাদ গ্রাম: পুতাল, থানা: মানিকগঞ্জ, জেলা: ঢাকা ৷ ২১. নং- ৩০৩১০১৮ হাবিলদার আজিজুল হক এস.এস. িজ পিতা: মি. সেরাজুল হক গ্রাম: কাচিয়া, থানা: গৌরনদী, জেলা: বরিশাল ৷ ২২. পাক/৩৭০৪০ এস এ সি মাহফুজুর বারী পিতা: মৌঃ এ. কে. মোহাম্মদ গ্রাম: চরলক্ষী, থানা: রামগতি, জেলা: নোয়াখালী ৷ ২৩. পাক/৭৩০৪ সার্জেন্ট শামসুল হক পিতা: হাজী সাদিক আলী গ্রাম: নৈরাজপুর, থানা: ফেনী, জেলা: নোয়াখালী ৷ ২৪. পি এস এস-১০০৫২০ মেজর শামসুল আলম এএমসি পিতা: মি. শামসুজজোহা ১৬নং খাজা দেওয়ান ২য় গলি, ঢাকা ৷ ২৫. পি এস এস-৬১০০ ক্যাপ্টেন মোঃ আবদুল মোতালেব পিতা: মি. হাজিফ উদ্দিন গ্রাম: দারুনবাইরাতি, থানা: পূর্ব ধলা, জেলা: ময়মনসিংহ ৷ ২৬. পি টি সি-৫৭২৭ ক্যাপ্টেন এ শওকত আলী মিয়া পিতা: মুন্সি মুবারক আলী গ্রাম: চাকধা, থানা: নারিয়া, জেলা: ফরিদপুর ৷ ২৭. পি এ-৬৫৬১ ক্যাপ্টেন খন্দকার নাজমুল হুদা পিতা: মৃত খন্দকার মোয়াজ্জেম হোসেন পশ্চিম বগুড়া রোড, বরিশাল শহর, এ,এসসি, বরিশাল ৷ ২৮. ক্যাপ্টেন এ.এন.এম নুরুজ্জামান ইবিআর পিতা: মৌঃ আবু আহমেদ গ্রাম: সাইদাবাদ, থানা: রায়পুরা, জেলা: ঢাকা ৷ ২৯. পাক/৭০৭০৪ সার্জেন্ট আবদুল জলিল পিতা: মৌলভী আবদুল কাদির সারাবাদ হাজী বাড়ী, নারায়ণপুর, ঢাকা ৷ ৩০. মি. মোঃ মাহবুব উদ্দিন চৌধুরী পিতা: আলহাজ্ব মৌলভী আজিজুদ্দিন মোহাম্মদ চৌধুরী গ্রাম: পিয়ইম, থানা: চৈতিয়ান, জেলা: সিলেট ৷ ৩১. পি.নং-৯৫৮ আই লে. এস.এম.এম. রহমান পিতা: মি. মোল্লা মোহাম্মদ সোলায়মান গ্রাম: মাকরাইল, থানা: লোহাগড়া, জেলা: যশোর ৷ ৩২. প্রাক্তন সুবেদার এ. কে. এম তাজুল ইসলাম পিতা: মৌলভী দলিল উদ্দিন আহমেদ গ্রাম: শ্রীপুর, থানা-ভাণ্ডারিয়া, জেরা: বরিশাল ৷ ৩৩. মি. মোহাম্মদ আলী রেজা পিতা: মৌঃ জহুরআলী আহমেদ গ্রাম: লাহিনী, থানা: কোতোয়ালী, জেলা: কুষ্টিয়া ৷ ৩৪. পি.এসএস. ২০০ ও ৪৭১ ক্যাপ্টেন খুরশিদ উদ্দিন এ.এমসি. পিতা: মৌ: আবদুর রহমান গ্রাম: বাঁশিয়া, থানা: গফরগাঁও, জেলা: ময়মনসিংহ ৷ ৩৫. পি নং-৯৪৪, আই লে. আবদুর রউফ পিতা: আলহাজ্ব আবদুল লতিফ পাকিস্তান হাউস, ভৈরব, জেলা: কিশোরগঞ্জ ৷ (চলবে) 
সূত্রঃএকুশে

স্বাধীনতাপূর্ব কিছু চমকপ্রদ ঘটনা

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা ঠিক কি নিয়ে এনিয়ে আলোচনার আগে দেখা যাক কোন গ্রাউন্ডে গ্রেফতার হয়েছিলেন কমান্ডার মোয়াজ্জেম ও তার সঙ্গীরা। ঢাকা থেকে সে সময় মার্কিন দূতাবাসের পাঠানো এক তারবার্তায় জানা যায় যে ১০ ডিসেম্বর ১৯৬৭ সালে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের প্রাণনাশের একটি পরিকল্পনা করা হয় চিটাগাং ক্লাবে বসে। সেটা গোয়েন্দাদের কানে আসে। ৯ ডিসেম্বর পিআইএর চিটাগাং ব্রাঞ্চের ম্যানেজার মির্জা রমিজকে গ্রেফতার করা হয়। তার সঙ্গে রাজনীতিবিদ সাইদুর রহমান, বিভূতিভূষন ওরফে মানিক চৌধুরী, দুই সাবেক নৌ বাহিনী কর্মকর্তা সুলতান উদ্দিন আহমেদ ও কামালউদ্দিন আহমেদকে। বরিশাল থেকে লঞ্চ বোঝাই অস্ত্রসহ আটক করা হয় কমান্ডার মোয়াজ্জেমকে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মিলিয়ে গ্রেপ্তারের সংখ্যা ৫০ থেকে ৬০ জন। এদের মধ্যে ১২ জনকে বিশেষ নিরাপত্তায় পশ্চিম পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। আইয়ুব এই ঘটনায় ভীষণ ভয় পেয়েছেন এবং এয়ার ভাইস মার্শাল আসগর খানকে অনুরোধ করেছেন তার বিমানের চালক হতে। টেলিগ্রামটা এরকম : Department of State TELEGRAM SECRET 832 PAGE 01 RAWALP 02518 2814172
52
ACTION NEA 15
INFO GPM 03, SC 01, RSC 01, USIA 12. li 02, NSC M L (13. INR 07,P 04, CIA 04, DOD 01, SP 02, SS 200PR 02, NSAE 00, RSR 01, MM 01. /089 W
R 281210Z DEC 67
FM AMEMBASSY RAWALPINDI
TO AMEMBASSY NEW DELHI 877
SECSTATE WASHDC 2837
SECRET RAWALPINDI 2.518
II/W DACCA 1029 3(110830, ACTION RAWALPINDI, INFO KARACHI, LAHORE, CALCUTTA AND PESHAWAR REPEATED FOR UR INFO: QUOTE.
SUBJECT : ABORTIVE COUP-ASSASINATlON PLOD
REF: DACCA�s A-133, DACCA 950, 978, 996, 1000, 1002, 1014, 1015, KARACHI�s 1122
1. Analysis of accumulated information seems to indicate that a comparatively small number of Bengali civil servants, ex-military officers, military officers, and politicians planned to assassinate President Ayub Khan during his recent visit to East Pakistan and to follow up the assassination with a coup d�etat aimed at establishing an independent state in East Pakistan. GOP security agencies detected plot before conspirators could act and subsequently arrested between 50 and 60 Bengalis. Authorities seem to be attempting to conceal both existence of plot and arrests. Resume of previously reported and recently required information follows. 2. Senior member of Chittagong Club stated that in early December several Bengalis met at Chittagong Club to plan assassination of President Ayub during his planned December 10 visit to Chittagong. Plan apparently called for elimination of Ayub during flight from Dacca to Chittagong on Chartered PIA air craft and involved PIA personnel at Dacca and Chittagong. Special Branch plain clothe men reportedly overheard plotters meeting at Chittagong Club and alerted GOP about plot. 3. In pre-dawn hours of December 9 several of conspirators were arrested in Chittagong and Dacca. According to fragmentary newspaper report, among those arrested were M. M. Rameez (PIA Chittagong city) Awami League leaders Syedur Rahman and Biphuti Bhusan (aka Manik Choudhury), and two ex-Pak Navy officers Kamuluddin Ahmed and Sultanuddin Ahmed, both residents of Dacca. Subsequently acquired information from sources who are believed to be well informed indicates that between fifty and sixty Bengalis (according to one source 54) have been arrested in connection with plot. This number reportedly includes five senior civil servants(CSP�s), several ex-military officers, military officers on active duty, and opposition politicians. A heretofore reliable source said that senior Bengali CSP who had recently been named to head an East Pakistan government corporation was involved in plot. 4. Subsequently Ayub�s visit to Chittagong city cancelled and Ayub was flown to Kaptai (near Chandraghana where he dedicated textile mill) by West Pakistan PAF pilot in military amphibian. 5. Several sources said that conspirators planned to follow up assassination with coup d�etat aimed at establishing independent East Pakistan. In this regard, one source who has previously given Consulate General accurate information said an exPakistan Navy Lieutenant Commander was arrested at Barisal with a motor launch load of arms which had 33. smuggled across border from West Bengal. 6. Twelve arrested conspirators reportedly have been sent to West Pakistan. 7. Several sources indicate President Ayub�s composure badly shaken by plot and that he delayed his departure from East Pakistan for one day both to confer with senior government servants and to bring his personal aircraft from West Pakistan to fly him to Karachi. Two source, stated that Ayub requested PL. chief Air Marshal Ashgar Khan to pilot aircraft to West Pakistan, GP-3. KILLGORE
UNQUOTE. OEHLERT

জানুয়ারিতে একটি সম্পূরক টেলিগ্রামে বিস্তারিত বলা হয় : ৮ ডিসেম্বর ১৯৬৭। রাত ঘনিয়েছে। চট্টগ্রামের এক অন্ধকার গলিতে দাড়িয়ে আছেন মির্জা রমিজ। বান্ধবীকে বিদায় দিয়ে এবার বউর কাছে যাচ্ছেন। বেশ নার্ভাস দেখাচ্ছে তাকে, প্রচণ্ড মাতালও। গত মাসতিনেক ধরেই পানের মাত্রা বেড়ে গেছে তার। রমিজ খুব ভয়ে আছেন। কিছুদিন ধরেই বুঝতে পেরেছেন তার পেছনে গোয়েন্দা লেগেছে। এ সপ্তাহের শুরুতেই এক বন্ধু জানিয়েছেন যে পুলিশ তাকে ও তার বন্ধুদের গ্রেপ্তার করতে যাচ্ছে। শুনে পালানোর কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু তার কাছে পর্যাপ্ত টাকা নেই, এমন জায়গাও নেই লুকানোর। চার ঘণ্টা পর, রাত তিনটার দিকে তার দরজায় কড়া নাড়ে স্পেশাল ব্রাঞ্চ। ৯ ডিসেম্বর ভোর। একজন সাবেক কলেজ অধ্যাপকের ঘুম ভাঙ্গালেন তার এক প্রাক্তন ছাত্র। ভীত কণ্ঠে জানালেন তাকে আর তার বন্ধুদের গ্রেপ্তারের জন্য খুজছে পুলিশ। তাদের বিরুদ্ধে �রাজনৈতিক এক ষড়যন্ত্রের� অভিযোগ আনা হয়েছে। কি করবেন জানতে চাইলে অধ্যাপক তাকে বললেন গা ঢাকা দিতে। এই গা ঢাকার ব্যাপারটা ঠিক বুঝলেন না তিনি। আন্ডারগ্রাউন্ড শব্দটা কমিউনিস্টদের ব্যাপারস্যাপার, তার জানা নেই। তার সতীর্থ ও রাজনৈতিক দলের নেতারা নিশ্চয়তা দিয়ে বলেছিলেন এই পরিকল্পনাটা কখনোই ফাঁস হবে না। তাই পালানোর কোনো বিকল্প ব্যবস্থার কথাও ভাবা হয়নি। ২২ ডিসেম্বর একজন তরুণ আইনজীবির সামনে দেখা গেলো তাকে। দু সপ্তাহের অমানুষিক অত্যাচারের চিহ্ন সারা শরীরে। বলছেন-�বিশ্বাস করুন, আমি ইচ্ছে করে কিছু বলিনি, আমাকে বাধ্য করা হয়েছে।� ঢাকা ও চিটাগাং ক্লাবে তরুণ বাঙালীদের আগের চেয়ে বেশ নীরব দেখা যাচ্ছে। ঈদটা নিরানন্দেই কেটেছে তাদের। বাতাসে ভয়ের গন্ধ। হালকা শুভেচ্ছা বিনিময়ের বাড়তি কিছু করছে না কেউ। পাঞ্জাবী ও অবাঙ্গালীদের বিদ্রূপেও নিশ্চুপ তারা, আগের মতো পাল্টা জবাব নেই। কেউ জানে না কে বিশ্বাসঘাতক, কে গোয়েন্দাদের হয়ে কাজ করছে। জানুয়ারির শুরুর এক ভোরে সাবমেশিন গান ও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রে সজ্জিত সেনা সদস্যরা ঢাকা সেন্ট্রাল জেল থেকে এক বন্দীকে সরিয়ে নিলো। এখানে বছর দুয়েক ধরে বন্দী ছিলেন তিনি। খবরটা মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়লো- মুজিবকে সরিয়ে নিয়েছে সেনাবাহিনী। কিন্তু কোথায়, কেউ জানে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলে এক বৈঠকে মিলিত হলেন কিছু আইনের ছাত্র। সেনা কবলে থাকা মুজিবকে উদ্ধারে কি করা যায়! শুধু প্রতিবাদ মিছিল কিংবা মিটিং করাটা যথেষ্ট ঠেকছে না। কিন্তু বিকল্প কিছু কেউ জানে না, অনেকেই ভয় পেয়ে গেছে খুব। বড় ভাই যারা এখন আওয়ামী লীগের নেতা, আর সহানুভূতিশীল শিক্ষকরাও কোনো সাহায্যে আসছেন না। শুধু বলেছেন, �আপাতত চুপচাপ থাকো।� কথাটা পছন্দ হয়নি তরুণ তুর্কিদের- বাঙালী আর কতো পড়ে পড়ে মার খাবে? হতাশ, বিহ্বল ও ভীতির পাশাপাশি রওয়ালপিন্ডির প্রতি ঘৃণা এখন প্রতিটি শিক্ষিত বাঙালী যুবকের মধ্যে কাজ করছে। আর সেটা সংক্রামিত হচ্ছে সবার মাঝেই। সারমর্ম ও সিদ্ধান্ত : ঢাকা ও চট্টগ্রামে গোপন খোজখবর, বেশ কয়েকজনের সঙ্গে আলোচনা ও তথ্যের সত্যতা যাচাই শেষে নিশ্চিত হওয়া গেছে বেশ কিছু বাঙালী সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা, কিছু নীচু সারির রাজনীতিক ও ব্যবসায়ী গত দু�বছর ধরে পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন করার ষড়যন্ত্র করছিলেন। ষড়যন্ত্রকারীদের অনেকেই গোলমেলে ব্যক্তিত্বের অধিকারী, পাশাপাশি পরিল্পনাটাও ছিলো বেশ আনাড়িপনায় ভরপুর। গত ডিসেম্বরে কয়েকজনকে গ্রেফতারের মধ্যে দিয়েই এর সমাপ্তি ঘটেছে। ভারতীয় সংশ্লিষ্টতা যদি থেকেও থাকে তবে তা ছিলো আর্থিক সহায়তাতেই সীমাবদ্ধ। আমাদের মনে হয় না গত ডিসম্বরে পূর্ব পাকিস্তান সফরে আইয়ুব খানের প্রাণনাশের কোনো পরিকল্পনা আদৌ ছিলো। পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী সম্ভবত এটা শুনেছে মির্জা মোহাম্মদ রমিজের কাছে। মুখ আলগা এই সাবেক বিমান বাহিনী কর্মকর্তা গত ডিসেম্বর পর্যন্ত পিআইএর চট্টগ্রাম জেলার ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। গত ৮ ডিসেম্বর গ্রেফতার করার আগে কয়েকমাস ধরেই তাকে নজরবন্দী রেখেছিলো গোয়েন্দারা। যতই আনাড়ি শোনাক, তবে ষড়যন্ত্র যে ছিলো এটা ঠিক। পশ্চিম পাকিস্তানীদের নিয়ন্ত্রিত কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে বাঙালীদের ঐতিহ্যবাহী শত্রুতা এখন বেআইনী পথ ধরেছে। এ ঘটনার প্রতিক্রিয়া হিসেবে দুপক্ষে অবিশ্বাসের দূরত্বটা আরো বাড়বে। তাছাড়া শেখ মুজিবকে যদি এই ঘটনায় যুক্ত করা হয়, তা শেষ পর্যন্ত বাঙালী স্বাধীকার আন্দোলনের একজন বীর হিসেবেই তাকে প্রতিষ্ঠিত করে ছাড়বে। (চলবে)

সূত্রঃ যৌবন যাত্রা

ঢাবিতে আগরতলা মামলায় অভিযুক্তদের সম্মাননা প্রাদান



স্বাধীনতা সংগ্রামের উপেক্ষিত নায়ক মানিক চৌধুরী

নাসিরুদ্দিন চৌধুরী


আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে ভূপতি ভূষণ চৌধুরী ওরফে মাণিক চৌধুরীর অবদান কতখানি, তা নিরুপণের চেষ্টা কখনো হয়নি। তাঁর ভূমিকার যথাযথ মূল্যায়ন না হওয়ার জন্য তিনি নিজেও কম দায়ী নন। দরাজ হস্তে দান করাতে যত অকৃপণ ছিলেন, নিজেকে জাহির করতে ততটাই কৃপণ ছিলেন মাণিক চৌধুরী। ফলে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের খুবই কাছের ও আস্থাভাজন মানুষ হওয়া সত্ত্বেও তাঁর ওপর প্রচারের আলো পড়েনি। বঙ্গবন্ধুর পরিবারে তিনি যে আদরের ছোট ভাইটির মতো বিশেষ একটি স্থান করে নিয়েছিলেন এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রসত্মুতিমূলক গোপন ও প্রকাশ্য নানা কর্মকাণ্ডে মাণিক চৌধুরী যে বিশেষ সহায় ও নির্ভরতার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন, সেটাও বা কজনের জানা। স্বাধীনতার জন্য মাণিক চৌধুরী নিজেকে এমনভাবে নীরবে নিঃশেষে বিলীন করে দিয়েছিলেন যে, তাঁর ব্যক্তি পরিচয় সেখানে গৌণ হয়ে পড়েছিলো। যতদিন তিনি জীবিত ছিলেন, তাঁর অন্য সব পরিচয়কে ছাপিয়ে এই পরিচয়টাই বড় হয়ে উঠেছিলো যে, তিনি আগরতলা মামলার অন্যতম অভিযুক্ত ছিলেন। কিন্তু তাঁর প্রয়াণের পর ত্রিশ বছরের ব্যবধানে সেই পরিচয়ও স্মৃতি থেকে ঝাপসা হতে হতে বিস্মৃতির আড়ালে চাপা পড়ে গেছে। পঞ্চাশ, ষাট, সত্তরের দশকে মাণিক চৌধুরী নামে যে একজন শীর্ষস্থানীয় প্রভাবশালী রাজনীতিক ছিলেন চট্টগ্রামে, সেটা এখন মনে করিয়ে না দিলে নতুন প্রজন্মের জানার কথা নয়। শুধু চট্টগ্রাম কেন, জাতীয় পর্যায়েও একজন বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতা হিসেবে তিনি মর্যাদাবান ছিলেন। জাতীয় রাজনীতিতে ভূমিকা রাখার জন্য তিনি স্বাধীনতার পূর্বে ঢাকায় বাসা নিয়ে অস্থায়ীভাবে এবং স্বাধীনতার পরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। বাংলাদেশের প্রকৃত ইতিহাস কখনো রচিত হলে মাণিক চৌধুরী তাতে নিঃসন্দেহে একজন জাতীয় বীর হিসেবেই চিহ্নিত হবেন । উন্মেষ থেকে ধাপে ধাপে রক্তাক্ত আন্দোলনের সিঁড়ি বেয়ে যে স্বাধীনতা সংগ্রাম বিকশিত ও পুষ্ট হয়েছে ক্রমবিকাশের ধারায় , তার কেন্দ্রে অবস্থান নিয়ে প্রস্ফুটিত হয়েছেন শেখ মুজিবুর রহমান- জাতির আকাঙক্ষা ও স্বপ্ন চেতনায় ধারণ করে যিনি হয়ে ওঠেন জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি, জাতি সত্তার প্রতীক ‘‘বঙ্গবন্ধু”, ‘‘জাতির জনক” ।
গ্যালাক্সির এই উজ্জ্বলতম জ্যোতিষ্ককে ঘিরে ছোট বড় অনেক জ্যোতিষ্কের সমাবেশ ঘটেছিল । এই তারামন্ডলেরই এক প্রান্তে নীরব নিভৃতে অবস্থান করেও যিনি স্বীয় প্রভায় সমুজ্জ্বল, আপন বিভূতির বিভায় জ্যোতির্ময় হয়ে আছেন , তিনি ঐ গ্যালাক্সিরই এক ‘‘মাণিক’’ , মাণিক চৌধুরী । নেতৃত্বের উত্থানপর্বেই বঙ্গবন্ধুর যাঁরা ছায়াসঙ্গী ছিলেন, মাণিক চৌধুরীকে দেখা গেছে তাদের অগ্রভাগে । পূর্ববঙ্গে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদ্ভব ও বিকাশ এবং তার স্বপ্ন ও আকাঙক্ষাকে ধারণ করে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের আত্মপ্রকাশ ও ক্রমশ পূর্ববঙ্গের পলিমাটি ও মানুষের অনত্মরে ঠাঁই খুঁজে পাওয়া বাংলাদেশ আন্দোলনের ক্ষেত্র তৈরি করেছিলো । এর পরের ইতিহাস বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ও প্রসারে আওয়ামী লীগের প্রথমে অনুঘটকের ভূমিকা পালন এবং পরে তাকে চূড়ানত্ম স্বাধীনতা সংগ্রামের পথে এগিয়ে নিয়ে পর্যায়ক্রমিক আন্দোলনের মাধ্যমে যে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি হচ্ছিলো মাণিক চৌধুরী একই সঙ্গে তার সাক্ষী, প্রত্যক্ষদর্শী ও কুশীলব ছিলেন। পঞ্চাশের দশকে ঢাকায় আওয়ামী লীগ তেমন বড় কোন দল ছিলো না। এই সময় যাদের ত্যাগ, নিষ্ঠা ও শ্রমে আওয়ামীলীগ ঢাকার বুকে শক্ত ঘাঁটি খুঁজে পেয়েছিলো, তাদের মধ্যে এই দলের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রবীণ মওলানা ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, টাঙ্গাইলের শামসুল হক, ইয়ার মোহাম্মদ খান, মহল্লা সর্দার হাফিজ মুসার নাম বাদ দিলে যাদের নাম উল্লেখের দাবি রাখে তারা হলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ, সাবেক মন্ত্রী ও রাষ্ট্রদূত শামসুল হক, গাজী গোলাম মোস্তফা, কমলাপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান, স্বাধনীতার পর রেডক্রসের ভাইস চেয়ারম্যান ও পরিবার পরিকল্পনা সমিতির সেক্রেটারি জেনারেল ময়েজ উদ্দিন আহমদ, প্রবীণ সাংবাদিক বাহাউদ্দিন চৌধুরী, ঢাকার সাবেক মেয়র হানিফের ভাই সুলতান, খসরু, নিজাম, আলী হোসেন প্রমুখ। শামসুল হক ও ময়েজ উদ্দিন যথাক্রমে ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। বাহাউদ্দিন চৌধুরী ঢাকা সিটি আওয়ামী লীগের সভাপতি হয়েছিলেন সম্ভবত হাফিজ মুসার পরে। মাণিক চৌধুরী এই সময় চট্টগ্রামের এম.এ আজিজ ও জহুর আহমদ চৌধুরীর সাথে আওয়ামী লীগের গোড়াপত্তনে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি ঢাকার পূর্বোক্ত নেতাদের সাথে সাংগঠনিক কাজকর্মে নিজেকে নিবেদিত করতেন। লেখার কলেবর বৃদ্ধির আশংকায় আমি আতাউর রহমান খান, আবুল মনসুর আহমদ, মওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী কামরুজ্জামান, আবদুস সালাম খান প্রমুখ জাতীয় নেতার নাম উল্লেখ থেকে বিরত থাকলাম। ঢাকায় আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠালগ্নের যে সব নেতার নাম উল্লেখ করা হলো তারা পরে সবাই মাণিক চৌধুরীর বন্ধু হয়ে যান। বিশেষ করে শামসুল হক, গাজী গোলাম মোসত্মফা, ময়েজ উদ্দিনের সাথে তাঁর গাঢ় বন্ধুত্ব সৃষ্টি হয়। তাজ উদ্দিনের সাথেও তাঁর শ্রদ্ধাপূর্ণ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এই জাতীয় নেতা কারাগারে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হওয়ার পূর্ব পর্যনত্ম অটুট ছিলো। আরো দুজন বিশিষ্ট ব্যক্তি বলিয়াদির জমিদার পরিবারের সনত্মান আহারাম ছিদ্দিকী ও কাবাডি ফেডারেশনের কাজি আনিস, মাণিক চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। এরাই আবার বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন । সুতরাং মাণিক চৌধুরী চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ ছিলেন বলে তাঁকে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক নেতা বলে অবজ্ঞা করার কোনো উপায় নেই। তিনি চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের নেতা এম এ আজিজ ও সিটি আওয়ামী লীগের নেতা জহুর আহমদ চৌধুরীর উভয়ের বিশ্বাসের পাত্র ও সেতুবন্ধ ছিলেন এবং বঙ্গবন্ধু ও চট্টগ্রামের এ দুনেতার সম্পর্কের মাঝে মাণিক চৌধুরীরও একটি স্থান ছিলো।
মাণিক চৌধুরীর রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপের যারা হদিস দিতে পারতেন, ঢাকার আরহাম সিদ্দিকী, বাহাউদ্দিন চৌধুরী, কাজী আনিস ও আলী হোসেন এবং চট্টগ্রামের ডা. সৈয়দুর রহমান চৌধুরী ছাড়া সকলেই এখন প্রয়াত রাজনৈতিক অঙ্গনের বাইরের একজন মানুষের সঙ্গেও মাণিক চৌধুরীর গভীর সম্পর্ক ছিলো। তিনি হচ্ছেন প্রয়াত শিল্পী দেবদাস চক্রবর্তী। জীবিতদের মধ্যে বাহাউদ্দিন চৌধুরী ছাড়া আর কারো লেখার অভ্যাস নেই। তাছাড়া তারা বয়সের ভারে ন্যুব্জ। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো আমি কি ভুলিতে পারি’ একুশে ফেব্রুয়ারীর এই অমর গানের স্রষ্টা আব্দুল গাফ্‌ফার চৌধুরী তাঁর ‘সিভিল ব্যুরোক্রেসি ও আর্মি ব্যুরোক্রেসি’ গ্রন্থে ষাটের দশকে তাঁর সম্পাদিত ‘আওয়াজ’ পত্রিকার আলোচনা প্রসঙ্গে মাণিক চৌধুরীর উপর কিছুটা আলোকপাত করেছেন। অন্যান্য সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী আওয়াজ পত্রিকার জন্য মাণিক চৌধুরী তাঁর স্ত্রীর গহনা বিক্রি করে অর্থ জোগান দিয়েছেন এবং জহুর আহমদ চৌধুরীসহ চট্টগ্রাম থেকে বিজ্ঞাপন সংগ্রহ করেছিলেন বলে জানা গেলেও গাফ্‌ফার চৌধুরীর লেখায় তার উল্লেখ নেই।
এমতাবস্থায়, যেহেতু মাণিক চৌধুরীর জীবন ও কর্ম নিয়ে কোনো গ্রন্থ রচিত হয়নি এবং পত্রপত্রিকায়ও তেমন কোন লেখালেখি হয়নি, সেহেতু বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের অধিকারী এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম নায়ক ও আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক হওয়া সত্ত্বেও তিনি উপেক্ষিত থেকে গেছেন। তাঁর সময়ের এক আলোচিত ও আলোকিত ব্যক্তিত্বের অনালোচিত ও অনালোকিত থেকে যাওয়া জাতীয় পাপ ও দৈন্যের বহিঃপ্রকাশ বলেই মনে করি। বঙ্গবন্ধুর আমলসহ আওয়ামী লীগ তিন দফায় এদেশের রাষ্ট্রক্ষমতা পেলেও মাণিক চৌধুরীকে তাঁর প্রাপ্য স্বীকৃতি দেয়ার উদ্যোগ নেয়নি। এখনো আওয়ামী লীগই ক্ষমতায় আছে। বঙ্গবন্ধু তনয়া শেখ হাসিনা ঢাকা সেনানিবাসে যেখানে আগরতলা মামলার বিচার হয়েছিলো, সেখানে একটি জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং আগরতলা মামলার অভিযুক্ত ও তাদের পরিবারবর্গকে আমন্ত্রণ জানিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মান ও স্বীকৃতি দিয়েছেন। কিন্তু মাণিক চৌধুরীর অবদান যে শুধু আগরতলা মামলাতে সীমাবদ্ধ নয়, তার কিছু ইঙ্গিত আমি ইতিমধ্যে দেয়ার চেষ্টা করেছি। আগরতলা মামলার অভিযুক্তদের জাতীয় বীর হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া উচিত। কারণ আগরতলা মামলা না হলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অত তাড়াতাড়ি ও সহজে আসতো কিনা সন্দেহ। জাতীয় বীরের মধ্যে মাণিক চৌধুরীর স্থান হওয়া উচিত অগ্রভাগে। আগরতলা মামলার ঘটনায় প্রথম দিকে প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যরাই জড়িত ছিলেন। তাদের সাথে যুক্ত হন তিনজন সিএসপি অফিসার এবং মাণিক চৌধুরীর ও বিধান কৃষ্ণ সেনসহ আরো দুএকজন বেসামরিক ব্যক্তি। কিন্তু প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যরা যে পরিকল্পনা নিয়েছিলেন, তাতে ভারতের সাহায্যের প্রয়োজন ছিলো। ভারত সরকারের কাছ থেকে সাহায্যের সম্মতি আদায়ের কঠিন কাজটির দায়িত্ব পড়েছিলো মাণিক চৌধুরীর ওপর। আগরতলার মাধ্যমে দিল্লির কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ ঘটিয়ে দিয়েছিলেন মাণিক চৌধুরী। সেজন্য গ্রেফতারের পর তাঁর ওপরই সবচেয়ে বেশি নির্যাতন চালানো হয়েছিলো। মাণিক চৌধুরীর জ্যেষ্ঠপুত্র দীপংকর চৌধুরী কাজলসহ নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে দিল্লি সফরকালে চিত্তরঞ্জন পার্কে অবসর জীবন যাপনকারী একাত্তরে সাউথ ব্লকের বাংলাদেশ ডেস্কে কর্মরত একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা আমাকে জানিয়েছেন, পঞ্চাশের দশকের শেষের দিকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বাংলাদেশ স্বাধীন করার জন্য আরো একটি উদ্যোগ নেয়া হয়েছিলো। কিন্তু তা ফলপ্রসূ হয়নি। সেবারও মুখ্য ভূমিকায় ছিলেন মাণিক চৌধুরী। তাঁর কাছ থেকেই জানা গেল, মুক্তিযুদ্ধে ভারত সরকারের সহায়তার পেছনে বড়ো ভূমিকা রেখেছেন মাণিক চৌধুরী।
আগরতলা মামলায় অভিযুক্ত বর্তমানে কানাডা প্রবাসী মাহফুজুল বারী জানিয়েছেন, ১৯৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধে বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হওয়ার পূর্বেই চট্টগ্রামের মাণিক চৌধুরী এবং বরিশালের চিত্তরঞ্জন সুতারকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন ভারতে অবস্থান নিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রস্তুতিমূলক কাজ করবার। সে সময় দক্ষিণ কলকাতায় একটি বাড়িও ভাড়া করা হয়েছিলো দাপ্তরিক কাজের জন্য।
আমি জানিনা মাণিক চৌধুরীর বয়সের কোনো নেতা, যিনি আবার সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক, গেরিলা যুদ্ধ করার জন্য তরুণ গেরিলাদের সাথে অধিকৃত দেশে প্রবেশ করেছেন কিনা। কিন্তু দুঃসাহসী মাণিক চৌধুরী সেই কাজটিই করেছেন। তিনি দাড়ি টুপি লাগিয়ে মুসলমান শিক্ষকের ছদ্মবেশ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে সবচেয়ে বিপদ সংকুল জায়গা ঢাকা শহরে একটি গেরিলা দলকে নেতৃত্ব দিয়ে নিয়ে আসেন। এই গ্রুপটি যাত্রাবাড়ির গেরিলা গ্রুপ হিসেবে পরিচিত ছিলো। তরুণ গেরিলাদের সাথে পাল্লা দিয়ে মাণিক চৌধুরী গেরিলা অপারেশনে অংশ নেন। শুধু ঢাকা না, তিনি চট্টগ্রামেও এসেছিলেন ছদ্মবেশে।
এতো গেলো মাণিক চৌধুরীর চরিত্রের সাহসিকতার দিক। ভয়ডর বলে কিছু ছিলো না তাঁর। ঢাকা শহরে পাঞ্জাবি মিলিটারি গিজগিজ করছে, এমনি বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতে মাণিক চৌধুরী রেডিও নন্দিত এনাউন্সার হেনা কবিরের পরিবারকে দেখার জন্য তাদের বাসায় যান এবং সার্ভেন্ট কোয়ার্টারে ছদ্মবেশে অবস্থানও করেন। হেনা কবিরকে মাণিক চৌধুরী ছোট বোন হিসেবে দেখতেন।
মাণিক চরিত্রের আর যেসব গুণ দাগ কাটে সেগুলি হলো তিনি ছিলেন একজন দিলখোলা, স্পষ্টভাষী মানুষ, আড্ডাবাজ, খোশ মেজাজের ফূর্তিবাজ লোক। অমিতব্যয়ী, বেহিসেবী। পটিয়ার একটি বর্ধিষ্ণু জমিদার ও খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়িক পরিবারের সনত্মান হিসেবে ব্যবসা বাণিজ্য ভালোই বুঝতেন। কিন্তু যা উপার্জন করতেন তা দুই হাতে বিলিয়ে দিতেন দলের নেতা কর্মীদের মাঝে। সঞ্চয়ের কোনো মনোবৃত্তি ছিলোনা। সেজন্য তাঁর মৃত্যুর পরে দেখা গেলো স্ত্রী-পুত্র-কন্যার ভরণ পোষণের জন্যও কিছু রেখে যাওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি তিনি। দলের ব্যয় নির্বাহের জন্য আয় করতে হবে এটাই ছিলো তাঁর নীতি। পাকিসত্মানি জমানায় চট্টগ্রাম জেলা ও সিটি আওয়ামী লীগ, কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ , এমনকি বঙ্গবন্ধুরও যখনই টাকা পয়সার প্রয়োজন হয়েছে, পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন মাণিক চৌধুরী। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ও জামাতা ড. ওয়াজেদ মিয়ার আকদ্‌ অনুষ্ঠানে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন মাণিক চৌধুরী। আমি যে এসব কথা লিখছি মাণিক চৌধুরী লজ্জিত হতেন। কারণ তিনি দান করে দানের কথা কাউকে বলতেন না ।
দল চালানোর জন্যই ষাটের দশকে তাদের খাতুনগঞ্জের গদিতে নতুন এজেন্সি নামে একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান চালু করেন। বঙ্গবন্ধুও নাকি সেই প্রতিষ্ঠানের অংশীদার ছিলেন। তারা একটি স্টিল মিলও প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। এখন বুঝতে পারছি আগরতলার ঘটনার প্রাক-প্রসত্মুতি ছিলো এই নতুন এজেন্সি।
সাম্প্রদায়িক পরিবেশে তিনি ছিলেন একজন প্রকৃত অসাম্প্রদায়িক মানুষ। হিন্দু-মুসলমান ভেদাভেদ ছিলো না তাঁর কাছে। এই অসাম্প্রদায়িক চেতনা তার চরিত্রে দুটি ছাপ ফেলেছিলো।
এক, তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনায় দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসী হলেন এবং বাংলাদেশ কায়েমের জন্য নিজের সমস্ত জীবন দিয়ে আত্মনিয়োগ করলেন। পরিবার হলো উপেক্ষিত। এমন আদর্শবান, নিবেদিতপ্রাণ
আপাদমসত্মক রাজনীতিক আজকের দিনে খুঁজে পাওয়া যাবে না।
দুই, সমাজতন্ত্রের প্রতি তাঁর অনুরাগ জন্মাল। যার ফলশ্রুতিতে তিনি আজিজ মিয়ার মত মওলানা ভাসানীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুললেন। সময় ও সুযোগ পেলেই মওলানার খোঁজখবর নিতেন। একবার মওলানা অসুস্থ হয়ে পিজিতে ভর্তি হলে মাণিক চৌধুরী তাঁকে দেখতে গিয়েছিলেন।
সমাজতন্ত্রের প্রতি ঝোঁকের কারণে কিংবা অন্য কোনো কারণে হোক তিনি স্বাধীনতার পর দেবেন শিকদার, আবুল বাশার ও মাহবুব উল্লাদের সাথে ভিড়ে জাতীয় গণমুক্তি ইউনিয়ন (জাগমুই) নামে একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠায় প্রবর্তনা পেলেন। এই দল করতে গিয়ে আওয়ামী লীগের সাথে তার ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে একবার তিনি ফকিরের পুল বাজারে একটি ব্রিফকেসে ভরে নিয়ে দেবেন সিকদারকে একটি রিভলভার ও বেশ কিছু টাকা দিয়েছিলেন সংগঠনের কাজে। মাণিক চরিত্রের একটি প্রহেলিকা হলো এই জাগমুই অধ্যায়। সারাজীবন আওয়ামী লীগ করে হঠাৎ করে কেন স্বাধীন দেশে তিনি বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে একটি রাজনৈতিক দল খাড়া করতে গেলেন সেটা আমার বোধগম্য নয়। অন্যদিকে তাঁর বন্ধু ও আগরতলা মামলায় আরেক অভিযুক্ত বিধান কৃষ্ণ সেন, জাসদ নামে আরেকটি বিরোধী দল গড়তে আদাজল খেয়ে লেগে গেলেন। দুই বন্ধুর এই দুটো কাজ আমার কাছে দুর্বোধ্য রয়ে গেল।
মাণিক চৌধুরীর জীবনের আরেকটি অজানা কাহিনী হলো তাজউদ্দিন সাহেব জেলখানা থেকে মাণিক চৌধুরীর কাছে একটি চিরকুট পাঠিয়েছিলেন। ইন্দিরা গান্ধীর উদ্দেশে লেখা ঐ চিঠিতে তাজউদ্দিন পঁচাত্তরের গোলযোগপূর্ণ ঘটনাবলীর প্রেক্ষাপটে ভারতের হসত্মক্ষেপ কামনা করেছিলেন। কিন্তু জেলখানার কোনো সিপাইর মাধ্যমে পাঠানো সেই চিঠি মাণিক চৌধুরীর কাছে পৌঁছেনি। তবুও মাণিক চৌধুরী ও শামসুল হক দিল্লিতে গিয়ে ম্যাডাম গান্ধীর সাথে দেখা করার জন্য ভারতে গিয়েছিলেন। কিন্তু যেদিন তাদের যাওয়ার কথা, তার আগের রাতে মাণিক চৌধুরী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তারা দিল্লি যেতে পারলে বাংলাদেশের ইতিহাস হয়তো অন্যখাতে প্রবাহিত হতো।

 সূত্রঃ দৈনিক আজাদী