মানিক চৌধুরীর মরণোত্তর সন্মাননা গ্রহণ করছেন দীপংকর চৌধুরী কাজল ২৭ ২ ২০১১ইং

শনিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১১

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামি ভূপতি ভূষণ চৌধুরী ওরফে মানিক চৌধুরী

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামি ছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অন্যতম সহযোগী চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনের প্রবাদপুরুষ জহুর আহমদ চৌধুরীর অন্যতম সহযোগী ভূপতি ভূষণ চৌধুরী ওরফে মানিক চৌধুরী।

চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনের অন্যতম সিংহপুরুষ বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক চৌধুরী ১৯৩০ সালের ১৬ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের পটিয়া থানার হাবিলাসদ্বীপ গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা ধীরেন্দ্র লাল চৌধুরী, মা যশোদা বালা চৌধুরী। চট্টগ্রাম শহরের রামজয় মহাজন লেনের পৈতৃক বাড়ি থেকে জীবনযুদ্ধ ও লেখাপড়ার হাতেখড়ি। ছোটবেলা থেকে তিনি খুবই মেধাবী ছাত্র ছিলেন, যা প্রতিনিয়ত প্রমাণ করেছেন মানিক চৌধুরী। চট্টগ্রামের মিউনিসিপ্যাল স্কুল থেকে ইংরেজিতে লেটার নিয়ে প্রথম বিভাগে পাস করে কলকাতা যান পড়াশোনা করতে। বঙ্গবাসী কলেজে অধ্যয়নরত অবস্থায় রাজনীতিতে হাতেখড়ি এবং ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যোগ দেন। আইএ পাস করেন প্রথম বিভাগে। ইতোমধ্যে পিতার মৃত্যুতে দেশে ফিরে আসেন এবং লেখাপড়ার ইতি ঘটিয়ে পারিবারিক ব্যবসা-বাণিজ্যে আত্মনিয়োগ করেন। মানিক চৌধুরীর প্রকৃত নাম ভূপতি ভূষণ চৌধুরী। জমিদার ধীরেন্দ্র চৌধুরীর একমাত্র ছেলে ছিলেন তিনি। প্রফুল্ল চৌধুরী ও তেজেন্দ্র চৌধুরী তার পিতৃব্য। তিনি অল্প বয়সে পিতৃহীন হন। প্রফুল্ল চৌধুরীর কোন ছেলে সন্তান ছিল না। তাদের পুরনো গদি ছিল খাতুনগঞ্জে। পরে তারা সত্যেন্দ্র কবিরাজের বিল্ডিং খরিদ করে আছদগঞ্জে তথা পোস্ট অফিসের গলির মুখে চলে আসেন। বাবার মৃত্যুর পর প্রকৃতপক্ষে কাকার স্নেহ-ভালবাসাতেই তিনি বড় হন।

জ্ঞান হওয়া অব্দি তিনি ছিলেন অসাম্প্রদায়িক। অন্যান্য হিন্দু লোকের মতো দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া বা একই সঙ্গে ভারত-পাকিস্তানের নাগরিক হওয়ার মতো সুবিধাবাদী কখনও তিনি ছিলেন না। বিপুল অর্থ উপার্জন করতেন আর খরচ করতেন দু'হাতে। সেজন্য বিপুল আয় সত্ত্বেও লাগামহীন ব্যয়ের কারণে তার কোন আক্ষেপও ছিল না। তিনি বেহিসেবী ও বেপরোয়া জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন। জন এফ কেনেডি যাকে ঝুঁকির মুখে সাহসিকতা বলেছেন তা তার মধ্যে পুরোপুরি বিদ্যমান ছিল। বিপদে বিচলিত হয়েছেন কদাচিৎ। মনেপ্রাণে ভালবাসতেন বাংলাদেশকে। তাই সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কলকাতা বা পূর্ব পাকিস্তানের বাইরে কোন সম্পত্তি অর্জন করেননি। জেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ ছিলেন তিনি। ১৯৬৬ সালের পূর্ব পর্যন্ত তিনি তাই ছিলেন। তার পরিবার ও তিনি আওয়ামী লীগের কত উপকার করেছেন তার কোন হিসাব নেই। রাজনীতি করতে গিয়ে তিনি গাঁটের পয়সা খরচ করেছেন, রাজনীতি থেকে কোন ফায়দা আদায় করেননি। একান্নবর্তী পরিবারের সদস্য ছিলেন, ঝড়ঝাপটা সব গেছে মাস্টার বাবুর ওপর দিয়ে তিনি বলতেন বড় বাবু। তার সঙ্গে জহুর আহমদ চৌধুরীর সম্পর্ক ছিল সহোদর ভ্রাতার মতো।

১৯৪৭-এ দেশ ভাগের অল্পকাল পরে শ্রী চৌধুরী মওলানা ভাসানীর ঘনিষ্ঠ সানি্নধ্যে আসেন এবং পরবর্তীতে মুসলিম লীগবিরোধী অসাম্প্রদায়িক আন্দোলনে যোগ দেন। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকে তিনি এ সংগঠনের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েন এবং মরহুম এমএ আজিজ, মরহুম জহুর আহমদ চৌধুরীর সঙ্গে একত্রে চট্টগ্রামে সংগঠন গড়ে তোলার কাজে ব্যাপৃত হন। '৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনকালীন শ্রী চৌধুরী এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং মরহুম হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সংস্পর্শে আসেন। এ সময়ই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তার প্রগাঢ় বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে এবং জেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ হিসেবে নির্বাচিত হন। '৬২-এর সামরিক আইনবিরোধী আন্দোলনসহ বিভিন্ন গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল আন্দোলন বিশেষ করে ৬ দফা আন্দোলনে তার ভূমিকার জন্য তিনি চট্টগ্রামের রাজনীতিতে অন্যতম মুখ্য ব্যক্তিতে পরিণত হন। '৬৬-এর ২০ মে রাতে পাকিস্তান প্রতিরক্ষা আইনে তাকে গ্রেফতার করা হয় এবং তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় জড়িত করে তার বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার অভিযোগ আনা হয়। তাকে কারাগারে চরমভাবে অমানবিক নির্যাতন করা হয়। '৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে তিনি আবার মুক্তি পান কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যে ইয়াহিয়ার সামরিক জান্তা তাকে আবার গ্রেফতার করে। '৭০-এর শেষ দিকে জেল থেকে ছাড়া পেয়ে তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনে সক্রিয় অংশ নেন ও মুক্তিযুদ্ধকে সংগঠিত করার কাজে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন।

মানিক চৌধুরী বিডিও হয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৬৫ সালে জহুর আহমদ চৌধুরী জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে পরাজিত হলে মানিক চৌধুরী তার আইডেন্টিটি কার্ড টুকরো টুকরো করে ছুড়ে ফেলে দেন। সেদিন যারা বিডি হিসেবে জহুর আহমদ চৌধুরীর বিরোধিতা করেছে আজ তাদের অনেকেই আওয়ামী লীগ নেতা ও রাষ্ট্রদূত। মানিক দা কখনও সেরকম করেননি। সুদিনে-দুর্দিনে তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর নিত্যসঙ্গী। শেখ সাহেবের ব্যাপারটা দেখাশোনা করতেন তার ফুফাত ভাই খোকা মিঞা। এই খোকা ভাই-ই '৭১ সালে দীর্ঘ ৯ মাস বঙ্গবন্ধুর ৩২নং বাড়ি দেখাশোনা করতেন। বঙ্গবন্ধুর হত্যার দিন তার বাড়িতেও গোলাগুলি হয়।

এখানে উল্লেখ্য, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ আওয়ামী লীগের সে যুগের তিনজন প্রভাবশালী নেতা ডা. সাইদুর রহমান চৌধুরী (সহ-সভাপতি, চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম সিটি আওয়ামী লীগ), ভূপতি ভূষণ চৌধুরী ওরফে মানিক চৌধুরী (কোষাধ্যক্ষ, চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগ), বিধান কৃষ্ণ সেনকে (সাংগঠনিক সম্পাদক, চট্টগ্রাম শহর আওয়ামী লীগ) গ্রেফতারপূর্বক অভিযুক্ত করা হয়েছিল। বাংলাদেশের আর কোথাও কোন আওয়ামী লীগ এবং তার সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগের কোন কর্মীকে তথাকথিত ও আগরতলা মামলায় পাকিস্তান সরকার অভিযুক্ত করেনি। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধু, চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের তিনজন নেতা, সিভিল সার্ভিস ও সেনাবাহিনীসহ মোট ২৭ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল।

তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি ও চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের মূল চালিকা শক্তি হিসেবে খ্যাত ডা. সাইদুর রহমান চৌধুরী, মানিক চৌধুরী ও বিধান কৃষ্ণ সেনের নিয়মিত আড্ডা ছিল চট্টগ্রাম স্টেশন রোডের রেস্ট হাউজের ২৩নং রুমে।

বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় মূলত ১৯৬২ সালের আইয়ুবের সামরিক শাসনবিরোধী এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মুক্তি আন্দোলনের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানে নবজাগরণের সূত্রপাত ঘটে। আর ১৯৭০-এর নির্বাচন এবং ১৯৭১-এর রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার দ্বারাই এ আন্দোলনের সফল পরিসমাপ্তি ঘটে। সে সময়কার ছাত্র-জনতার সব মিছিলে নেপথ্যে সহায়তা প্রদানকারী ছিলেন মানিক চৌধুরী। এমনকি কোন সময় মানিক মিছিলের অগ্রভাগে থেকে আবার কোন সময় মিছিলের শেষভাগে সবাইকে উৎসাহ জোগাতেন। রাজনৈতিক মিটিং-মিছিল শেষে বাণী কোম্পানির (লালদীঘির সোনালী ব্যাংকের কাছে) মাইকের খরচ, কর্মীদের আপ্যায়ন, প্রচারকার্যে ব্যবহৃত ঘোড়ার গাড়ি ও বেবিট্যাক্সির ভাড়া দেয়ার জন্য যখন সব নেতাকর্মী বিব্রতকর অবস্থায় পড়তেন তখনই দেখা যেত ঘটনাস্থলে মানিক চৌধুরী। এসে তার সহজ-সরল সমাধান করে দিতেন।

কোন মন্তব্য নেই: