মানিক চৌধুরীর মরণোত্তর সন্মাননা গ্রহণ করছেন দীপংকর চৌধুরী কাজল ২৭ ২ ২০১১ইং

রবিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১১

বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রেক্ষাপট ও বিপ্লবী মানিক চৌধুরী

মাহ্‌ফুজুল বারী

Bookmark and Share

আমি ১৯৫৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে যোগদান করি। প্রাথমিক ট্রেনিংয়ের পর করাচিতে প্রতিষ্ঠিত স্কুল অব এরোনটিকস (ইলরমভটর্লধড্র) থেকে বিমানের অর্ভ্ররলবণর্ভ ঋভথধভণণরধভথ বিভাগে তিন বছর শিক্ষা গ্রহণ করি। ১৯৬২ সালে আমিই প্রথম বাঙালি যে বিমান বাহিনীর সদস্য হিসেবে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের ভাইস কাউন্ট ডিভিশনে যোগ দেই যার অবস্থান ছিল করাচির ড্রিগরোডে। ১৯৬২ সালের শেষদিকে প্রথমবারের মত আমি চট্টগ্রামে দুই মাসের জন্য ছুটিতে যাই। ডিসেম্বর মাসের শেষদিকে (সঠিক তারিখ মনে নেই) তখনকার ‘বঙ্গশার্দুল’ শেখ মুজিব চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগ কর্তৃক আয়োজিত জন সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন। তিনি পাকিস্তানের দুই অংশের পর্বতপ্রমাণ অর্থনৈতিক বৈষম্যের যে চিত্র লাখো জনতার সামনে উপস্থিত করেন তাতে যেন আমার অন্তরের কথাই প্রতিধ্বনিত হয়। কেননা করাচি যাওয়ার পর পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের অস্তিত্বের ওপর আমার স্বপ্ন ভাঙতে শুরু করে। ঐদিনের বক্তৃতার পর থেকে তার নেতৃত্ব এবং ব্যক্তিত্বের প্রতি প্রবলভাবে আকৃষ্ট হয়ে যাই।
এভাবে দেখতে দেখতে ৬৩-৬৪ সাল পারে হয়ে গেল। দিনের পর দিন সশস্ত্র বাহিনীতে কর্মরত বাঙালি চাকরিজীবীদের ওপর পাকিস্তানিদের দুর্ব্যবহার ও লাঞ্ছনা বেড়েই চলল। সামান্য অজুহাতে চাকরিচ্যূতি ও পদন্নোতির ব্যাপারে নগ্ন বৈষম্য হয়ে ওঠল নিত্যকার ব্যাপার। প্রতিবছর পাকিস্তান সরকারের কেন্দ্রীয় বাজেটের ৭৫% ব্যয় হতো পশ্চিম পাকিস্তানে, আর প্রতিরক্ষা বাজেটের ক্ষেত্রে তার পরিমাণ ছিল ৯০%। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের সচিব পর্যায়ে একজন বাঙালিও ছিল না। যদিও আমরা বাঙালিরা ছিলাম মোট জনসংখ্যার ৫৬%। তৎকালীন পাকিস্তানের সরকারে ১২৬টি দেশে দূতাবাস ছিল যেখানে মাত্র ১ জন বাঙালি রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন। শিক্ষাক্ষেত্রে কমনওয়েলথ সহ অন্যান্য দেশ কর্তৃক যত বৃত্তি দেয়া হতো তার ৯০ ভাগ বরাদ্দ হতো করাচি এবং ইসলামাবাদের জন্য। আইয়ুব খান ক্ষমতা দখলের পর করাচি থেকে ইসলামাবাদে নতুন রাজধানী স্থাপন করেন। কৃষিকাজে জলসেচের জন্য তারবেলা এবং মঙ্গলা বাঁধ নির্মাণে খরচ করেন বর্তমান বাজার মূল্যে দুই লাখ হাজার কোটি টাকা। বাৎসরিক উন্নয়নের ৮০ ভাগই বরাদ্দ হতো পশ্চিম পাকিস্তানে। প্রদত্ত বৈদেশিক সাহায্য প্রাপ্তির ক্ষেত্রেও একই বৈষম্যমূলক নীতি চালু ছিল। এই হলো সার সংক্ষেপে বৈষম্যের চিত্র।
পাকিস্তান আমলে বাৎসরিক বাজেট বরাদ্দের বিস্তারিত তথ্য দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনৈতিক বিভাগে আজো পাওয়া যাবে। প্রতিনিয়ত বন্ধু-বান্ধব এবং সহকর্মীদের ভেতর এইসব নিয়ে আলোচনা হতো। আলোচনা হতো কিভাবে এ অত্যাচার থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।
মৌলিক গণতন্ত্র নামে এক অদ্ভুত গণতন্ত্র প্রবর্তনের মাধ্যমে আইয়ুব খান ১৯৬৪ সালে এক প্রহসনমূলক নির্বাচনে ফাতেমা জিন্নাহকে পরাজিত করে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ১৯৬৫ সনের ৪ জানুয়ারি তখনকার বঙ্গশার্দুল করাচিতে আগমন করেন। আমি আমার অন্য দুই বন্ধু বিমান বাহিনীর সদস্য হাবিবুর রহমান এবং বেলায়েত হোসেন সংগোপনে বঙ্গশার্দুল শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে করাচি বিমান বন্দরে সাক্ষাত করি। একান্তভাবে আলাপ করার জন্য পরবর্তী সাক্ষাতের স্থান হিসেবে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর জ্যেষ্ঠকন্যা আক্তার সোলায়মানের বাড়ি লাকাম হাউস এ মিলিত হবার সিদ্ধান্ত নিই। দুঃখের কথা এই যে, আমার সেই দুই বন্ধু আজ লোকান্তরিত।
বঙ্গবন্ধুর সাথে আলাপে আমরা একটা কথাই বললাম যে, পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ধর্মকে শোষণ এবং শাসনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। এদের মুখে শেখ ফরিদ বগলে ইট। শেখ মুজিব আমাদেরকে বললেন, দেশের যারা প্রতিনিধি হয়ে আসে তারা ব্যক্তিস্বার্থে পাকিস্তানি শিল্পপতিদের কাছে বিক্রি হয়ে যায়। অর্থাৎ তারা টাকার কাছে আত্মসমর্পণ করে। তিনি জোর দিয়ে বললেন, বেড়ায় ক্ষেত খায় আমি কি করব? অত্যাচার এবং বৈষম্যের অবসান করতে হলে সম্মিলিত প্রয়াসের প্রয়োজন,
শেখ মুজিবরের মত এমন একজন নিখাদ দেশপ্রেমিকের সাথে পরিচয়ের প্রভাব পরবর্তীতে আমাকে ঘটনাবহুল কর্মকাণ্ড ও স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে যুক্ত হতে সাহস ও অনুপ্রেরণা জোগায়। এটা আমার জন্য এক আকাশ ছোঁয়া গর্বের ব্যাপার।
বৈষম্য নিয়ে আলাপ-আলোচনার এক পর্যায়ে আমার সাথে এয়ারফোর্সের কর্পোরাল সিরাজুল ইসলাম এবং সার্জেন্ট আব্দুল জলিলের সাথে পরিচয় ঘটে। পরে ফ্লাইট সার্জেন্ট মফিজউল্লাহ, সার্জেন্ট জহুরুল হক, সার্জেন্ট শামসুল হক, নৌ বাহিনীর লে. মতিয়ুর রহমান, কমান্ডার (অব.) আব্দুল রউফ এবং টেক্সটাইল কোম্পানির ম্যানেজার মাহবুব উদ্দিনের সাথে পরিচয় ঘটে। বিভিন্ন সময়ে প্রয়াত লেফটেন্যান্ট মতিয়ুর রহমান এবং সার্জেন্ট আব্দুল জলিলের বাসায় বৈঠক করে আমরা সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে দেশকে স্বাধীন করার সিদ্ধান্তে উপনীত হই এবং বুঝতে পারি যে এ জন্য আমাদের প্রয়োজন রাজনৈতিক সমর্থন এবং সহযোগিতা। লেফটেন্যান্ট মতিয়ুর রহমান এবং মফিজউল্লাহ প্রথমে না বললেও এই সশস্ত্র বিপ্লবের নেতৃত্বে কমান্ডার মোয়াজ্জেম আগাগোড়াই ছিলেন, তা পরবর্তীতে আমাদের কাছে প্রকাশিত হয়।
এক পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে আমরা আমাদের সশস্ত্র বিপ্লবের প্রতি সমর্থন আদায়ের জন্য যোগ্য ও সাহসী বাঙালি রাজনীতিবিদদের সাথে যোগাযোগ করার সিদ্ধান্ত নেই। আমরা কয়েকজন বাঙালি নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সুস্পষ্ট আশ্বাস পেতে ব্যর্থ হই। সে সময়ে যারা সমর্থন দেন নি তাদের মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য হলেন-মাওলানা ভাসানী, মশিউর রহমান, ফজলুল কাদের চৌধুরী, সবুর খান, ফরিদ আহম্মদ এবং ইউসুফ আলী প্রমুখ। এক পর্যায়ে শেখ মুজিবের কাছ থেকে আমরা আশ্বাস এবং দিকনির্দেশনা পাই এবং এই নিয়ে তার সদিচ্ছার ব্যাপারে নিশ্চিত হই। এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে তিনি হবেন আমাদের তথা সারা দেশের প্রতিবাদী জনগণের নেতৃত্ব দানকারী সংগ্রামী নেতা।
বৈঠকে সমস্ত বিষয়ে সর্বোচ্চ গোপনীয়তা রক্ষার সিদ্ধান্ত হয়। নৌ বিমান এবং সেনাবাহিনীর সদস্যরা বিশ্বস্ত লোকজন নিয়ে ধীরে ধীরে পৃথক পৃথক গ্রুপ সৃষ্টির মাধ্যমে সংগঠিত হওয়ার অঙ্গীকার করে।
বন্দী হওয়ার আগ পর্যন্ত আমরা সরকারি কাজের ফাঁকে ফাঁকে সশস্ত্র প্রস্তুতির জন্য প্রতি নিয়তই গোপন বৈঠক করে সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধির কাজে নিয়োজিত থাকি। আমি ব্যক্তিগতভাবে আমাদের সংগঠনের একজন সদস্যের মাধ্যমে তখনকার মৌরিপুর করাচি এয়ারফোর্সের রেকর্ড অফিস থেকে ব্যক্তিগত ফাইল
সরিয়ে ফেলি, যাতে অন্যত্র বদলি হতে না হয় এবং করাচিতে বসেই সশস্ত্র প্রস্তুতির কাজে আত্মনিয়োগ করতে পারি। ফলে বন্দী হওয়া অবধি আমি একই কর্মস্থলে থেকে যাই।
অংশগ্রহণকারীরা সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামে এর বাস্তব রূপায়নের প্রকৃত কৌশল সম্পর্কে সবাই পুরোপুরি অবগত ছিলেন না। আমাদের মধ্যে এটা জানা ছিল যে সশস্ত্র প্রস্তুতির শেষে একদিন পূর্ব পাকিস্তানের সব ক্যান্টনমেন্টের অস্ত্রাগার দখল করে পশ্চিমা পাকিস্তানি সৈন্যদের বন্দী করে দেশকে স্বাধীন করা হবে এবং ‘বঙ্গশার্দুল’ ই হবেন দেশের প্রেসিডেন্ট।
সংগঠনের প্রস্তুতির কাজ চলে সমান্তরালভাবে বিভিন্ন গ্রুপে; করাচি, ঢাকা, চট্টগ্রামে অতি গোপনীয়ভাবে। এক পর্যায়ে আমরা জানতে পারি শেখ মুজিবুর রহমান কোন এক সময় সশস্ত্র বিদ্রোহের মাধ্যমে স্বাধীনতা সংগ্রামে ভারত সরকারের সমর্থন আদায়ের জন্য গোপনে ত্রিপুরা প্রদেশের রাজধানী আগরতলায় গিয়েছিলেন। তারই ফলোআপ হিসেবে দুটি বিষয়ে তৎকালীন দিল্লি সরকারের সমর্থন ও সহযোগিতা আদায় করা আমাদের জন্য ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পূর্ব পাকিস্তানের সকল ক্যান্টনমেন্টের অস্ত্রাগার দখলে নেয়ার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য আমাদের প্রয়োজন ছিল পর্যাপ্ত অস্ত্রের সরবরাহ আর ক্যান্টনমেন্ট দখল করে স্বাধীনতা ঘোষণার পরপরই দিল্লি সরকারের রাজনৈতিক স্বীকৃতি। এ দুটি বিষয়ে ইতিবাচক সমর্থন লাভের উদ্দেশ্যে লাহোরে অবস্থিত সিভিল সার্ভিস একাডেমির প্রফেসর প্রয়াত এম এ রেজা ও বিপ্লবী মানিক চৌধুরী ঢাকাস্থ ভারতীয় দূতাবাসের প্রথম রাজনৈতিক সচিব পি এন ওঝার মাধ্যমে ত্রিপুরা রাজ্যের গোপন জায়গায় ভারতীয় ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের সাথে বৈঠক করেন। ১৯৬৭ সালের অক্টোবর / নভেম্বরের দিকে কর্পোরাল আমীর হোসেন নামক বিমান বাহিনীর একজন বাঙালি কর্মকর্তা বিশ্বাসঘাতকতা করায় সশস্ত্র প্রস্তুতির মূল পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে যায়। তৎকালীন আইয়ুব সরকার ১৯৬৮ সালের ৬ জানুয়ারি এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র এবং বিদ্রোহ সংগঠনের কথা ঘোষণা করে। ২ সপ্তাহ পর ১৮ জানুয়ারি ১৯৬৮ সালে আরেকটি প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গশার্দুল শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রদ্রোহী ষড়যন্ত্রের আসামি ঘোষণা করা হয়।
দেশের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে দুইজন আওয়ামী লীগ নেতা, তিনজন সিভিল (সিএসপি) কর্মকর্তাসহ নৌ, বিমান এবং সেনাবাহিনী থেকে প্রত্যক্ষভাবে জড়িতদের চিহ্নিত করে মোট ৩৫ জনকে চার্জশিটভূক্ত আসামি করে রাষ্ট্রদ্রোহী মামল রুজু করা হয়। ১৯৬৮ সনের ১৯ জুন এই মামলায় রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব ও অন্যান্য শিরোনামে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় ১১ জনকে রাজসাক্ষী এবং ২ শতাধিক সামরিক এবং বেসামরিক লোককে সাক্ষী করা হয়। সহস্রাধিক সন্দেহভাজন সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য বেসামরিক কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেপ্তার করা হয়। ঐ সময় আমাকেও এই মামলায় আসামি হিসেবে অন্যান্যদের সাথে গ্রেপ্তার করা হয়। সরকার কর্তৃক গঠিত ঢাকা সেনানিবাসে স্পেশাল ট্রাইবুনালে মামলাটিকে রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব এবং অন্যান্য শিরোনামে ঋজু করা হলেও এটাকে দূরভিসন্ধিমূলকভাবে ভারতের ষড়যন্ত্র হিসেবে প্রচার করা হয় যাতে করে স্বাধীনতাকামী সৈনিক জনতার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে ক্ষেপিয়ে তোলা যায় ও শেখ মুজিবসহ বিপ্লবী সংগঠকদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে স্বাধীনতা আন্দোলনকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেয়া যায়। এ প্রচারে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এটর্নি পাঞ্জাবি মেজর নাসেরের ভূমিকাই ছিল মুখ্য। অন্যান্য অভিযুক্ত বন্দিদের সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আমাকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে স্থানান্তর করা হয়। ১৯৬৮ সনের জুনের ১৯ তারিখ পর্যন্ত নির্জন কক্ষে বন্দি ছিলাম। দেশের মানুষ এবং বহির্বিশ্ব তো দূরের কথা, আত্মীয়-স্বজনও জানতনা যে আমরা জীবিত না মৃত। সে সময় প্রায় প্রতিদিন একমাত্র বঙ্গবন্ধু ছাড়া আমাদের সকলকে সেনাবাহিনীর টর্চার সেলে নিয়ে গিয়ে সীমাহীন শারীরিক এবং মানসিক নির্যাতন করা হতো। এর মধ্যে পা বেঁধে উপুড় করে ঝুলিয়ে রেখে ব্যাটন দিয়ে নির্মমভাবে পেটানো হতো পায়ের তালুতে, গুহ্যদ্বারে বরফ ঢোকানো হতো এবং মানসিকভাবে নির্যাতনের জন্য রাতে আমরা যাতে ঘুমাতে না পারি এজন্য পাশের কক্ষে মাইক বাজানো হতো ও রুমে উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন বৈদ্যুতিক বাতি জ্বালিয়ে রাখা হতো। মামলা শুরু হবার পর অভিযুক্ত আমরা পরস্পরের সঙ্গে পরিচিত হবার কিঞ্চিত সুযোগ পাই।
১৯ জুন মামলা আরম্ভ হবার পরে আমার সঙ্গে পরিচয় ঘটে অভিযুক্ত চট্টগ্রামের সিটি আওয়ামী লীগের নেতা বিভূতি ভূষণ চৌধুরী ওরফে মানিক চৌধুরী এবং বিধান কৃষ্ণ সেনের সঙ্গে। বিচার চলাকালীন অবস্থার সকল অভিযুক্তদের সঙ্গে আমার সখ্যতা হলেও মানিক চৌধুরীর কথাবার্তায় আমি তার প্রতি বিশেষভাবে আকৃষ্ট হই। মানিক চৌধুরী ও বিধান কৃষ্ণ সেনের সাথে আমার দেখা হতো প্রতিদিন বিকালে কারাগারের খোলা চত্বরে অথবা খাবার ঘরে। তখন দেখতাম মানিক চৌধুরীর উপর পাকিস্তানিদের পাশবিক নির্যাতনের চিহ্ন। নির্যাতনে তার কান ও একটা চোখ অকেজো হয়ে যায়। আমাদের উপর নির্যাতন হলেও লেঃ কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন, বিধান কৃষ্ণ সেন, মানিক চৌধুরী এবং ষ্টুয়াড মুজিবের উপর নির্যাতনের মাত্রা ছিল সীমাহীন। নির্যাতনে লেঃ কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেনের ২টি দাঁত ভেঙে যায়। দেখতাম মানিক দা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছেন, তবুও তিনি নিম্নস্বরে হাসিমুখে আমাদের সাথে কথা বলতেন। গৌরবর্ণ ও মাঝারি গড়নের শান্ত সৌম্য মানিক চৌধুরীর অগাধ দেশপ্রেম, দেশকে নিয়ে ভবিষ্যত পরিকল্পনা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার সাথে পরিচিত হয়ে আমি মুগ্ধ হয়ে যাই। অনেক কথাই হয়েছে তাঁর সাথে। মতান্তরও ছিল কিছু কিছু বিষয়ে, কিন্তু মনান্তর হয়নি এক মুহূর্তের জন্য। দেশের মানুষদের মধ্যে অশিক্ষা, কুশিক্ষা ও কুসংস্কারের প্রভাব দেখে ব্যথিত হতেন এবং এর থেকে মুক্তির জন্য গণশিক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা বলতেন। সংস্কারমুক্ত বৈজ্ঞানিক সমাজের প্রতিষ্ঠায় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি আন্দোলনের রূপরেখা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করতেন। নারীমুক্তির জন্য নারীদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রশ্নে জোরালো অভিমত ব্যক্ত করতেন। পাকিস্তান নামক রাষ্ট্র মানবকল্যাণ ও সুস্থ বিকাশের পথে অন্তরায় এবং ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধির দ্বারা আচ্ছন্ন তা তিনি বিভিন্ন সময়ে প্রাঞ্জলভাবে আলোচনা করে বুঝিয়ে দিতেন। উপযুক্ত শিক্ষার অভাবে প্রজন্ম পরম্পরায় পাওয়া সাম্প্রদায়িক মূল্যবোধ যে মানবিক চেতনা ও সুকুমার বৃত্তিকে বিকশিত হতে দেয় না এবং চিন্তার
ক্ষেত্রকে সংকুচিত করে দেয়, এটাই ছিল তার কেন্দ্রীয় উপলব্ধি।
(চলবে)
সূত্রঃদৈনিক আজাদী

Bookmark and Share

কোন মন্তব্য নেই: