মানিক চৌধুরীর মরণোত্তর সন্মাননা গ্রহণ করছেন দীপংকর চৌধুরী কাজল ২৭ ২ ২০১১ইং

শনিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১১

বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রেক্ষাপট ও বিপ্লবী মানিক চৌধুরী

  1. মাহ্‌ফুজুল বারী
  2. Bookmark and Share
(গতকাল প্রকাশিতের পর)
মানিকদার সাহচর্য আমাকে স্বাদেশিকতা ও জাতীয়তবোধের গভীরে প্রবেশ করতে সাহায্য করে। আজ অনেক বছর পর যখন সুদূর কানাডায় বসে দেখি পাকিস্তানের সাম্প্রদায়িক ও ধর্মীয় রাজনীতির যাঁতাকলে পড়ে শিয়া সুন্নিতে হানাহানি, মসজিদে মসজিদে বোমাবাজি, সংঘাত, সন্ত্রাস ও রক্তপাত চলছে আর ইসলামী জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটছে; তখন সেনা নিবাসের বন্দী দিনগুলোতে মানিকদার কথোপথন আমাকে স্মরণ করিয়ে দেয় অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির প্রয়োজনীয়তা। মামলা চলাকালীন অবস্থায় বঙ্গবন্ধু তাঁর জামাতা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বামী প্রয়াত ওয়াজেদ মিয়ার মাধ্যমে তখনকার ডাকসুর ছাত্রনেতা জনাব তোফায়েল আহম্মদকে আত্মীয় পরিচয়ে অতি গোপনীয়তার সাথে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে মুক্তির আন্দোলন এবং পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলাপ করতেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ছাত্র জনতা সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে শেখ মুজিবসহ আসামিদের নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে ব্যাপক গণ আন্দোলনের সূচনা হয়। ঢাকা শহর আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি প্রয়াত গাজী গোলাম মোস্তফার বলিষ্ঠ সাংগঠনিক দক্ষতাও এ মামলার বিরুদ্ধে জনগণকে সংগঠিত করতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।
লন্ডন প্রবাসী বাঙালিরা আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রয়াত গাউস খানের নেতৃত্বে শেখ মুজিবসহ সকল আসামিদের নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে প্রতিনিয়ত মিছিল সমাবেশ ও অনেক অর্থ খরচ করে আইনি লড়াই পরিচালনার জন্য কুইন্স কাউন্সিলের নামকরা ব্যারিস্টার থমাস উইলিয়ামকে পূর্ব পাকিস্তানে পাঠিয়েছিলেন। তাঁর জেরার মুখে রাজসাক্ষীরা দিশেহারা হয়ে দেখতে পায় সরিষার ফুল। ক্যান্টনমেন্টে স্থাপিত ট্রাইবুনাল কক্ষে উপস্থিত সকলের কাছে আজও সে দৃশ্য স্মরণীয় হয়ে আছে। প্রায় ৪০ জন আইনজীবীর সমন্বয়ে গঠিত হয় ডিফেন্স টিম। তখন নামকরা যে সকল কৌসুলী এই মামলা পরিচালনায় মেধা দিয়ে নিরলস পরিশ্রম করেন তাদের মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হলেন জনাব সালাম খান, ব্যারিস্টার জেড এ আলম, জহির উদ্দিন, বদরুল হায়দার চৌধুরী, প্রাক্তন ডিআইজি আবদুল্লা, জুলমত আলী, ডা.. রাজী, প্রখ্যাত ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম, খান বাহাদুর নাসির উদ্দিন, আমিনুল হক এবং মীর হোসেন প্রমুখ।
সেই সময় আসামি পক্ষের কৌসুলী হওয়া সত্ত্বেও সরকারকে মামলা সংক্রান্ত গোপন তথ্য সরবরাহ করার অপরাধে ডিফেন্স টীম থেকে বহিষ্কার করা হয় মীর্জা গোলাম হাফিজকে। এই বিশ্বাসঘাতক আইনজীবীকে ৭৫ সনের পট পরিবর্তনের পর দেখা গেল জেনারেল জিয়ার মন্ত্রী পরিষদের সদস্য ও পরবর্তীতে স্পিকারের আসনে।
স্মৃতি বড় মধুর ও বেদনাদায়ক। মুক্তির আন্দোলন যখন চরমে ওঠে তখন ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ সালে ঢাকা সেনানিবাসে আটক অবস্থায় টয়লেটে যাওয়ার সময় সার্জেন্ট জহুরুল হক এবং ফ্লাইট সার্জেন্ট ফজলুল হককে এক পাকিস্তানী নিরাপত্তা রক্ষী সামনাসামনি গুলি করে ও মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য জহুরুলের শরীরের বেয়নেট চার্জ করে। পরে তিনি সি,এম,এইচ এ মারা যান। ফ্লাইট সার্জেন্ট ফজলুল হক প্রাণে বেঁচে যান। এই হৃদয় বিদারক ঘটনা আমরা জানালা দিয়ে প্রত্যক্ষ করেছি। এ ঘটনার পর আন্দোলন তীব্র হয়ে উঠে ও বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। সার্জেন্ট জহিরুল হকের আত্মাহুতির ফলে গণ বিস্ফোরণ ঊনসত্তরের গণ অভ্যুত্থানের রূপ নেয়। সরকার বিনা শর্তে ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ মামলা প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয়। মামলা প্রত্যাহারের পর সারা দেশ জুড়ে বাঙালিদের মধ্যে প্রাথমিক বিজয়ের আনন্দ হিল্লোল বয়ে যায়। শেখ মুজিবসহ সকল অভিযুক্তরা মুক্তি লাভ করলে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ সালে শেখ মুজিবকে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করে। তিনি পরিণত হলেন বাংলার অবিসংবাদিত নেতা কিংবদন্তীর চরিত্রে। এই মামলায় চট্টগ্রাম থেকে আমরা যারা অভিযুক্ত ছিলাম তাদের চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে প্রয়াত মন্ত্রী জহুর আহম্মদ চৌধুরীর নেতৃত্বে সংবর্ধনা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। চট্টগ্রামের তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা বর্তমানে চট্টগ্রামের সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরী ও এস,এম ইউসুফ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। মানিক চৌধুরী, বিধান কৃষ্ণ সেন এবং আমাকে বিপুল জনতার উপস্থিতিতে বিজয়মালায় অভিষিক্ত করা হয়।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা একটি অন্যতম মাইল ফলক। স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে এ মামলার গুরুত্ব অপরিসীম। সেই সময় পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের মনে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা গভীরভাবে রেখাপাত করে যার ফলে তখন থেকে সশস্ত্র আন্দোলন ও স্বাধীন বাংলাদেশের কথা জনগণের মধ্যে প্রকাশ্যেই উঠতে থাকে। স্বাধীন দেশের নাম ও মানচিত্র নিয়ে চিন্তা-ভাবনা চলতে থাকে ব্যাপকভাবে। আগরতলা মামলাকে কেন্দ্র করে যে সব বিরাট বিরাট ঘটনা ঘটে সেগুলো স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি অন্যতম স্রোতধারা।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে মুখ্য ভূমিকা পালনকারী হিসেবে অনেক রাজনৈতিক নেতাদের নাম উচ্চারিত হয়। কিন্তু আমার ভাবতে অবাক লাগে মানিক চৌধুরী ও বিধান কৃষ্ণ সেনসহ মামলার অভিযুক্ত অন্যান্য বিপ্লবীদের আমরা কিভাবে ভুলে গেলাম। ১৯৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধে বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হওয়ার আগেই চট্টগ্রামের মানিক চৌধুরী এবং বরিশালের প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য চিত্তরঞ্জন সুতারকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন ভারতে অবস্থান নিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রস্তুতিমূলক কাজ করবার। সে সময় দক্ষিণ কলকাতার একটি বাড়িও ভাড়া করা হয়েছিল দাপ্তরিক কাজের জন্য। যুদ্ধের সূচনা লগ্নে তাজউদ্দিন আহমেদ, সৈয়দ নজরুল ইসলামসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতারা ভারতের কলকাতায় আশ্রয় নিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধের পক্ষে সমন্বয় করেন। প্রথমে সেই বাড়ি থেকে (ঐতিহাসিক ৭ মার্চ ভাষণ দেবার বেশ কিছু আগে) যুদ্ধের বীজ বপনের দায়িত্ব পড়েছিল চিত্তরঞ্জন সুতার ও মানিক চৌধুরীর উপর। বঙ্গবন্ধু মানিক চৌধুরীকে যে কতটা বিশ্বাস করতেন এই ঘটনা তা থেকে প্রতীয়মান হয়।
১৯৭১ সনে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আমি যুদ্ধ সংক্রান্ত গোপন তথ্য আদান প্রদানের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলাম। এই কাজে আমি ত্রিপুরার উদয়পুরে ভারতীয় ব্রিগেডিয়ার সাবেক সিং এর অফিসে গেলে, সেখানে হঠাৎ একদিন মানিক চৌধুরীর সাথে দেখা হয়। আমি তাঁকে উচ্ছ্বাস ভরে ফাইন্যান্স মিনিস্টার হিসেবে সম্বোধন করি। কারণ স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র প্রস্তুতির প্রাক্কালে বিপ্লবী সংগঠনের কার্যক্রমের জন্য যে অর্থ তহবিলের প্রয়োজন ছিল, তার অন্যতম উৎস ছিলেন মানিক চৌধুরী। তিনি আমাকে বললেন, “দেশ স্বাধীন হবে, বঙ্গবন্ধু কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেবেন, কিন্তু জাতির শত্রুরা হয়তো তাঁর উপর অচিরেই আঘাত হানবে।” একই কথা বলেছিলেন জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক, চট্টগ্রামের অধিবাসী জনাব নিজাম উদ্দিন যিনি এখনও জীবিত আছেন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর বুঝতে পারি মানিক চৌধুরী কত দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মানুষ ছিলেন।
আমরা যারা একটি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে বাস করছি সে দেশটির বেশ কিছু দেশপ্রেমিক মানুষ নেতাকর্মীদের দীর্ঘদিনের ত্যাগ তিতিক্ষা ও ধারাবাহিক আন্দোলনও মুক্তি যুদ্ধের ফসল। সেটি হঠাৎ করে সামাজিক এবং রাজনৈতিক পরিচয়হীন কোন মেজর এর রেডিওতে স্বাধীনতা পাঠের প্রক্রিয়ার একদিনে অর্জিত হয় নি। মামলায় অভিযুক্ত ৩৫ জনের ভিতরে মাত্র ১১ জন বর্তমানে জীবিত আছি। মানিক দা ৫০ বছর বয়সে ১৯৮০ সালে আমাদেরকে ছেড়ে চলে গেছেন। তারই বিশেষ বন্ধু বিধান কৃষ্ণ সেনও আজ বেঁচে নেই। লোকান্তরিত বিপ্লবীদের জন্য রইল শ্রদ্ধা। আর জীবিতদের জন্য ভালোবাসা ও সংগ্রামী অভিবাদন। প্রয়াত বিপ্লবীদের অনেকের পরিবারের সদস্যরা আজ দুঃস্থভাবে কালাতিপাত করছেন, যার খবর কেউ রাখে না।
এ মামলার কোনো আসামির নামে বাংলাদেশের ন্যূনতম একটি রাস্তার নামকরণও করা হয় নি। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের বর্তমান মেয়র জনাব মহিউদ্দিন চৌধুরী একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং এই মামলার অনেক কিছুই তিনি জানেন। আমি আশা করি তিনি ক্ষমতায় থাকাকালে চট্টগ্রামের বিপ্লবী নেতা প্রয়াত মানিক চৌধুরী এবং বিধান কৃষ্ণ সেনের নামে রাস্তার নামকরণ করে তাঁদের প্রাপ্য মর্যাদার স্বীকৃতি এবং সস্মান দিয়ে কিছুটা হলেও ভারমুক্ত হবেন। চট্টগ্রামের একটি রাস্তার নাম কামাল আতার্তুক সড়ক। ভিনদেশী একজন জাতীয় বীরকে নিয়ে আমরা গর্ব করি ও পুলকিত হই। অথচ আমাদের দেশে অনেক জাতীয় বীর, মুক্তিযোদ্ধা এবং বিপ্লবী নেতা আজও উপেক্ষিত এবং বিস্মৃতির অতলে ডুবে গেছেন। তাঁদের জাতির সামনে উপস্থাপনের দায়িত্ব আমাদের। দুঃখের ব্যাপার হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সাফল্যের সাথে আগরতলা মামলার ঘটনাবলী বিশেষ অবদান রেখেছে সেগুলি আজকাল আমাদের মন থেকে যেন উধাও হতে চলেছে। তবে ইতিহাস যেহেতু তাকে ভুলতে দেয় না, অতীতের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এবং কথা কারো কারো মনে দোলা দেয় এবং মনে রাখার দাবি তোলেন এবং ঐতিহাসিক ঘটনাবলী একটু সহজ সরলভাবে নির্মোহ এবং নির্দলীয়ভাবে যদি কেউ লেখেন যাতে পরে তা স্কুল এবং কলেজে পাঠ্য করার জন্য বিশেষ সংরক্ষণে রূপান্তরিত করা যায় তাহলে জাতি তার কাছে কৃতজ্ঞ থাকবে। তিনি নিশ্চয়ই বীরের সম্মানে সম্মানিত হবেন। 
 

কোন মন্তব্য নেই: