মানিক চৌধুরীর মরণোত্তর সন্মাননা গ্রহণ করছেন দীপংকর চৌধুরী কাজল ২৭ ২ ২০১১ইং

রবিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১১

স্বাধীনতা সংগ্রামের উপেক্ষিত নায়ক মানিক চৌধুরী

নাসিরুদ্দিন চৌধুরী


আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে ভূপতি ভূষণ চৌধুরী ওরফে মাণিক চৌধুরীর অবদান কতখানি, তা নিরুপণের চেষ্টা কখনো হয়নি। তাঁর ভূমিকার যথাযথ মূল্যায়ন না হওয়ার জন্য তিনি নিজেও কম দায়ী নন। দরাজ হস্তে দান করাতে যত অকৃপণ ছিলেন, নিজেকে জাহির করতে ততটাই কৃপণ ছিলেন মাণিক চৌধুরী। ফলে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের খুবই কাছের ও আস্থাভাজন মানুষ হওয়া সত্ত্বেও তাঁর ওপর প্রচারের আলো পড়েনি। বঙ্গবন্ধুর পরিবারে তিনি যে আদরের ছোট ভাইটির মতো বিশেষ একটি স্থান করে নিয়েছিলেন এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রসত্মুতিমূলক গোপন ও প্রকাশ্য নানা কর্মকাণ্ডে মাণিক চৌধুরী যে বিশেষ সহায় ও নির্ভরতার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন, সেটাও বা কজনের জানা। স্বাধীনতার জন্য মাণিক চৌধুরী নিজেকে এমনভাবে নীরবে নিঃশেষে বিলীন করে দিয়েছিলেন যে, তাঁর ব্যক্তি পরিচয় সেখানে গৌণ হয়ে পড়েছিলো। যতদিন তিনি জীবিত ছিলেন, তাঁর অন্য সব পরিচয়কে ছাপিয়ে এই পরিচয়টাই বড় হয়ে উঠেছিলো যে, তিনি আগরতলা মামলার অন্যতম অভিযুক্ত ছিলেন। কিন্তু তাঁর প্রয়াণের পর ত্রিশ বছরের ব্যবধানে সেই পরিচয়ও স্মৃতি থেকে ঝাপসা হতে হতে বিস্মৃতির আড়ালে চাপা পড়ে গেছে। পঞ্চাশ, ষাট, সত্তরের দশকে মাণিক চৌধুরী নামে যে একজন শীর্ষস্থানীয় প্রভাবশালী রাজনীতিক ছিলেন চট্টগ্রামে, সেটা এখন মনে করিয়ে না দিলে নতুন প্রজন্মের জানার কথা নয়। শুধু চট্টগ্রাম কেন, জাতীয় পর্যায়েও একজন বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতা হিসেবে তিনি মর্যাদাবান ছিলেন। জাতীয় রাজনীতিতে ভূমিকা রাখার জন্য তিনি স্বাধীনতার পূর্বে ঢাকায় বাসা নিয়ে অস্থায়ীভাবে এবং স্বাধীনতার পরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। বাংলাদেশের প্রকৃত ইতিহাস কখনো রচিত হলে মাণিক চৌধুরী তাতে নিঃসন্দেহে একজন জাতীয় বীর হিসেবেই চিহ্নিত হবেন । উন্মেষ থেকে ধাপে ধাপে রক্তাক্ত আন্দোলনের সিঁড়ি বেয়ে যে স্বাধীনতা সংগ্রাম বিকশিত ও পুষ্ট হয়েছে ক্রমবিকাশের ধারায় , তার কেন্দ্রে অবস্থান নিয়ে প্রস্ফুটিত হয়েছেন শেখ মুজিবুর রহমান- জাতির আকাঙক্ষা ও স্বপ্ন চেতনায় ধারণ করে যিনি হয়ে ওঠেন জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি, জাতি সত্তার প্রতীক ‘‘বঙ্গবন্ধু”, ‘‘জাতির জনক” ।
গ্যালাক্সির এই উজ্জ্বলতম জ্যোতিষ্ককে ঘিরে ছোট বড় অনেক জ্যোতিষ্কের সমাবেশ ঘটেছিল । এই তারামন্ডলেরই এক প্রান্তে নীরব নিভৃতে অবস্থান করেও যিনি স্বীয় প্রভায় সমুজ্জ্বল, আপন বিভূতির বিভায় জ্যোতির্ময় হয়ে আছেন , তিনি ঐ গ্যালাক্সিরই এক ‘‘মাণিক’’ , মাণিক চৌধুরী । নেতৃত্বের উত্থানপর্বেই বঙ্গবন্ধুর যাঁরা ছায়াসঙ্গী ছিলেন, মাণিক চৌধুরীকে দেখা গেছে তাদের অগ্রভাগে । পূর্ববঙ্গে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদ্ভব ও বিকাশ এবং তার স্বপ্ন ও আকাঙক্ষাকে ধারণ করে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের আত্মপ্রকাশ ও ক্রমশ পূর্ববঙ্গের পলিমাটি ও মানুষের অনত্মরে ঠাঁই খুঁজে পাওয়া বাংলাদেশ আন্দোলনের ক্ষেত্র তৈরি করেছিলো । এর পরের ইতিহাস বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ও প্রসারে আওয়ামী লীগের প্রথমে অনুঘটকের ভূমিকা পালন এবং পরে তাকে চূড়ানত্ম স্বাধীনতা সংগ্রামের পথে এগিয়ে নিয়ে পর্যায়ক্রমিক আন্দোলনের মাধ্যমে যে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি হচ্ছিলো মাণিক চৌধুরী একই সঙ্গে তার সাক্ষী, প্রত্যক্ষদর্শী ও কুশীলব ছিলেন। পঞ্চাশের দশকে ঢাকায় আওয়ামী লীগ তেমন বড় কোন দল ছিলো না। এই সময় যাদের ত্যাগ, নিষ্ঠা ও শ্রমে আওয়ামীলীগ ঢাকার বুকে শক্ত ঘাঁটি খুঁজে পেয়েছিলো, তাদের মধ্যে এই দলের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রবীণ মওলানা ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, টাঙ্গাইলের শামসুল হক, ইয়ার মোহাম্মদ খান, মহল্লা সর্দার হাফিজ মুসার নাম বাদ দিলে যাদের নাম উল্লেখের দাবি রাখে তারা হলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ, সাবেক মন্ত্রী ও রাষ্ট্রদূত শামসুল হক, গাজী গোলাম মোস্তফা, কমলাপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান, স্বাধনীতার পর রেডক্রসের ভাইস চেয়ারম্যান ও পরিবার পরিকল্পনা সমিতির সেক্রেটারি জেনারেল ময়েজ উদ্দিন আহমদ, প্রবীণ সাংবাদিক বাহাউদ্দিন চৌধুরী, ঢাকার সাবেক মেয়র হানিফের ভাই সুলতান, খসরু, নিজাম, আলী হোসেন প্রমুখ। শামসুল হক ও ময়েজ উদ্দিন যথাক্রমে ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। বাহাউদ্দিন চৌধুরী ঢাকা সিটি আওয়ামী লীগের সভাপতি হয়েছিলেন সম্ভবত হাফিজ মুসার পরে। মাণিক চৌধুরী এই সময় চট্টগ্রামের এম.এ আজিজ ও জহুর আহমদ চৌধুরীর সাথে আওয়ামী লীগের গোড়াপত্তনে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি ঢাকার পূর্বোক্ত নেতাদের সাথে সাংগঠনিক কাজকর্মে নিজেকে নিবেদিত করতেন। লেখার কলেবর বৃদ্ধির আশংকায় আমি আতাউর রহমান খান, আবুল মনসুর আহমদ, মওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী কামরুজ্জামান, আবদুস সালাম খান প্রমুখ জাতীয় নেতার নাম উল্লেখ থেকে বিরত থাকলাম। ঢাকায় আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠালগ্নের যে সব নেতার নাম উল্লেখ করা হলো তারা পরে সবাই মাণিক চৌধুরীর বন্ধু হয়ে যান। বিশেষ করে শামসুল হক, গাজী গোলাম মোসত্মফা, ময়েজ উদ্দিনের সাথে তাঁর গাঢ় বন্ধুত্ব সৃষ্টি হয়। তাজ উদ্দিনের সাথেও তাঁর শ্রদ্ধাপূর্ণ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এই জাতীয় নেতা কারাগারে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হওয়ার পূর্ব পর্যনত্ম অটুট ছিলো। আরো দুজন বিশিষ্ট ব্যক্তি বলিয়াদির জমিদার পরিবারের সনত্মান আহারাম ছিদ্দিকী ও কাবাডি ফেডারেশনের কাজি আনিস, মাণিক চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। এরাই আবার বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন । সুতরাং মাণিক চৌধুরী চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ ছিলেন বলে তাঁকে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক নেতা বলে অবজ্ঞা করার কোনো উপায় নেই। তিনি চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের নেতা এম এ আজিজ ও সিটি আওয়ামী লীগের নেতা জহুর আহমদ চৌধুরীর উভয়ের বিশ্বাসের পাত্র ও সেতুবন্ধ ছিলেন এবং বঙ্গবন্ধু ও চট্টগ্রামের এ দুনেতার সম্পর্কের মাঝে মাণিক চৌধুরীরও একটি স্থান ছিলো।
মাণিক চৌধুরীর রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপের যারা হদিস দিতে পারতেন, ঢাকার আরহাম সিদ্দিকী, বাহাউদ্দিন চৌধুরী, কাজী আনিস ও আলী হোসেন এবং চট্টগ্রামের ডা. সৈয়দুর রহমান চৌধুরী ছাড়া সকলেই এখন প্রয়াত রাজনৈতিক অঙ্গনের বাইরের একজন মানুষের সঙ্গেও মাণিক চৌধুরীর গভীর সম্পর্ক ছিলো। তিনি হচ্ছেন প্রয়াত শিল্পী দেবদাস চক্রবর্তী। জীবিতদের মধ্যে বাহাউদ্দিন চৌধুরী ছাড়া আর কারো লেখার অভ্যাস নেই। তাছাড়া তারা বয়সের ভারে ন্যুব্জ। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো আমি কি ভুলিতে পারি’ একুশে ফেব্রুয়ারীর এই অমর গানের স্রষ্টা আব্দুল গাফ্‌ফার চৌধুরী তাঁর ‘সিভিল ব্যুরোক্রেসি ও আর্মি ব্যুরোক্রেসি’ গ্রন্থে ষাটের দশকে তাঁর সম্পাদিত ‘আওয়াজ’ পত্রিকার আলোচনা প্রসঙ্গে মাণিক চৌধুরীর উপর কিছুটা আলোকপাত করেছেন। অন্যান্য সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী আওয়াজ পত্রিকার জন্য মাণিক চৌধুরী তাঁর স্ত্রীর গহনা বিক্রি করে অর্থ জোগান দিয়েছেন এবং জহুর আহমদ চৌধুরীসহ চট্টগ্রাম থেকে বিজ্ঞাপন সংগ্রহ করেছিলেন বলে জানা গেলেও গাফ্‌ফার চৌধুরীর লেখায় তার উল্লেখ নেই।
এমতাবস্থায়, যেহেতু মাণিক চৌধুরীর জীবন ও কর্ম নিয়ে কোনো গ্রন্থ রচিত হয়নি এবং পত্রপত্রিকায়ও তেমন কোন লেখালেখি হয়নি, সেহেতু বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের অধিকারী এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম নায়ক ও আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক হওয়া সত্ত্বেও তিনি উপেক্ষিত থেকে গেছেন। তাঁর সময়ের এক আলোচিত ও আলোকিত ব্যক্তিত্বের অনালোচিত ও অনালোকিত থেকে যাওয়া জাতীয় পাপ ও দৈন্যের বহিঃপ্রকাশ বলেই মনে করি। বঙ্গবন্ধুর আমলসহ আওয়ামী লীগ তিন দফায় এদেশের রাষ্ট্রক্ষমতা পেলেও মাণিক চৌধুরীকে তাঁর প্রাপ্য স্বীকৃতি দেয়ার উদ্যোগ নেয়নি। এখনো আওয়ামী লীগই ক্ষমতায় আছে। বঙ্গবন্ধু তনয়া শেখ হাসিনা ঢাকা সেনানিবাসে যেখানে আগরতলা মামলার বিচার হয়েছিলো, সেখানে একটি জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং আগরতলা মামলার অভিযুক্ত ও তাদের পরিবারবর্গকে আমন্ত্রণ জানিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মান ও স্বীকৃতি দিয়েছেন। কিন্তু মাণিক চৌধুরীর অবদান যে শুধু আগরতলা মামলাতে সীমাবদ্ধ নয়, তার কিছু ইঙ্গিত আমি ইতিমধ্যে দেয়ার চেষ্টা করেছি। আগরতলা মামলার অভিযুক্তদের জাতীয় বীর হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া উচিত। কারণ আগরতলা মামলা না হলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অত তাড়াতাড়ি ও সহজে আসতো কিনা সন্দেহ। জাতীয় বীরের মধ্যে মাণিক চৌধুরীর স্থান হওয়া উচিত অগ্রভাগে। আগরতলা মামলার ঘটনায় প্রথম দিকে প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যরাই জড়িত ছিলেন। তাদের সাথে যুক্ত হন তিনজন সিএসপি অফিসার এবং মাণিক চৌধুরীর ও বিধান কৃষ্ণ সেনসহ আরো দুএকজন বেসামরিক ব্যক্তি। কিন্তু প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যরা যে পরিকল্পনা নিয়েছিলেন, তাতে ভারতের সাহায্যের প্রয়োজন ছিলো। ভারত সরকারের কাছ থেকে সাহায্যের সম্মতি আদায়ের কঠিন কাজটির দায়িত্ব পড়েছিলো মাণিক চৌধুরীর ওপর। আগরতলার মাধ্যমে দিল্লির কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ ঘটিয়ে দিয়েছিলেন মাণিক চৌধুরী। সেজন্য গ্রেফতারের পর তাঁর ওপরই সবচেয়ে বেশি নির্যাতন চালানো হয়েছিলো। মাণিক চৌধুরীর জ্যেষ্ঠপুত্র দীপংকর চৌধুরী কাজলসহ নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে দিল্লি সফরকালে চিত্তরঞ্জন পার্কে অবসর জীবন যাপনকারী একাত্তরে সাউথ ব্লকের বাংলাদেশ ডেস্কে কর্মরত একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা আমাকে জানিয়েছেন, পঞ্চাশের দশকের শেষের দিকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বাংলাদেশ স্বাধীন করার জন্য আরো একটি উদ্যোগ নেয়া হয়েছিলো। কিন্তু তা ফলপ্রসূ হয়নি। সেবারও মুখ্য ভূমিকায় ছিলেন মাণিক চৌধুরী। তাঁর কাছ থেকেই জানা গেল, মুক্তিযুদ্ধে ভারত সরকারের সহায়তার পেছনে বড়ো ভূমিকা রেখেছেন মাণিক চৌধুরী।
আগরতলা মামলায় অভিযুক্ত বর্তমানে কানাডা প্রবাসী মাহফুজুল বারী জানিয়েছেন, ১৯৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধে বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হওয়ার পূর্বেই চট্টগ্রামের মাণিক চৌধুরী এবং বরিশালের চিত্তরঞ্জন সুতারকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন ভারতে অবস্থান নিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রস্তুতিমূলক কাজ করবার। সে সময় দক্ষিণ কলকাতায় একটি বাড়িও ভাড়া করা হয়েছিলো দাপ্তরিক কাজের জন্য।
আমি জানিনা মাণিক চৌধুরীর বয়সের কোনো নেতা, যিনি আবার সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক, গেরিলা যুদ্ধ করার জন্য তরুণ গেরিলাদের সাথে অধিকৃত দেশে প্রবেশ করেছেন কিনা। কিন্তু দুঃসাহসী মাণিক চৌধুরী সেই কাজটিই করেছেন। তিনি দাড়ি টুপি লাগিয়ে মুসলমান শিক্ষকের ছদ্মবেশ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে সবচেয়ে বিপদ সংকুল জায়গা ঢাকা শহরে একটি গেরিলা দলকে নেতৃত্ব দিয়ে নিয়ে আসেন। এই গ্রুপটি যাত্রাবাড়ির গেরিলা গ্রুপ হিসেবে পরিচিত ছিলো। তরুণ গেরিলাদের সাথে পাল্লা দিয়ে মাণিক চৌধুরী গেরিলা অপারেশনে অংশ নেন। শুধু ঢাকা না, তিনি চট্টগ্রামেও এসেছিলেন ছদ্মবেশে।
এতো গেলো মাণিক চৌধুরীর চরিত্রের সাহসিকতার দিক। ভয়ডর বলে কিছু ছিলো না তাঁর। ঢাকা শহরে পাঞ্জাবি মিলিটারি গিজগিজ করছে, এমনি বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতে মাণিক চৌধুরী রেডিও নন্দিত এনাউন্সার হেনা কবিরের পরিবারকে দেখার জন্য তাদের বাসায় যান এবং সার্ভেন্ট কোয়ার্টারে ছদ্মবেশে অবস্থানও করেন। হেনা কবিরকে মাণিক চৌধুরী ছোট বোন হিসেবে দেখতেন।
মাণিক চরিত্রের আর যেসব গুণ দাগ কাটে সেগুলি হলো তিনি ছিলেন একজন দিলখোলা, স্পষ্টভাষী মানুষ, আড্ডাবাজ, খোশ মেজাজের ফূর্তিবাজ লোক। অমিতব্যয়ী, বেহিসেবী। পটিয়ার একটি বর্ধিষ্ণু জমিদার ও খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়িক পরিবারের সনত্মান হিসেবে ব্যবসা বাণিজ্য ভালোই বুঝতেন। কিন্তু যা উপার্জন করতেন তা দুই হাতে বিলিয়ে দিতেন দলের নেতা কর্মীদের মাঝে। সঞ্চয়ের কোনো মনোবৃত্তি ছিলোনা। সেজন্য তাঁর মৃত্যুর পরে দেখা গেলো স্ত্রী-পুত্র-কন্যার ভরণ পোষণের জন্যও কিছু রেখে যাওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি তিনি। দলের ব্যয় নির্বাহের জন্য আয় করতে হবে এটাই ছিলো তাঁর নীতি। পাকিসত্মানি জমানায় চট্টগ্রাম জেলা ও সিটি আওয়ামী লীগ, কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ , এমনকি বঙ্গবন্ধুরও যখনই টাকা পয়সার প্রয়োজন হয়েছে, পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন মাণিক চৌধুরী। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ও জামাতা ড. ওয়াজেদ মিয়ার আকদ্‌ অনুষ্ঠানে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন মাণিক চৌধুরী। আমি যে এসব কথা লিখছি মাণিক চৌধুরী লজ্জিত হতেন। কারণ তিনি দান করে দানের কথা কাউকে বলতেন না ।
দল চালানোর জন্যই ষাটের দশকে তাদের খাতুনগঞ্জের গদিতে নতুন এজেন্সি নামে একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান চালু করেন। বঙ্গবন্ধুও নাকি সেই প্রতিষ্ঠানের অংশীদার ছিলেন। তারা একটি স্টিল মিলও প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। এখন বুঝতে পারছি আগরতলার ঘটনার প্রাক-প্রসত্মুতি ছিলো এই নতুন এজেন্সি।
সাম্প্রদায়িক পরিবেশে তিনি ছিলেন একজন প্রকৃত অসাম্প্রদায়িক মানুষ। হিন্দু-মুসলমান ভেদাভেদ ছিলো না তাঁর কাছে। এই অসাম্প্রদায়িক চেতনা তার চরিত্রে দুটি ছাপ ফেলেছিলো।
এক, তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনায় দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসী হলেন এবং বাংলাদেশ কায়েমের জন্য নিজের সমস্ত জীবন দিয়ে আত্মনিয়োগ করলেন। পরিবার হলো উপেক্ষিত। এমন আদর্শবান, নিবেদিতপ্রাণ
আপাদমসত্মক রাজনীতিক আজকের দিনে খুঁজে পাওয়া যাবে না।
দুই, সমাজতন্ত্রের প্রতি তাঁর অনুরাগ জন্মাল। যার ফলশ্রুতিতে তিনি আজিজ মিয়ার মত মওলানা ভাসানীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুললেন। সময় ও সুযোগ পেলেই মওলানার খোঁজখবর নিতেন। একবার মওলানা অসুস্থ হয়ে পিজিতে ভর্তি হলে মাণিক চৌধুরী তাঁকে দেখতে গিয়েছিলেন।
সমাজতন্ত্রের প্রতি ঝোঁকের কারণে কিংবা অন্য কোনো কারণে হোক তিনি স্বাধীনতার পর দেবেন শিকদার, আবুল বাশার ও মাহবুব উল্লাদের সাথে ভিড়ে জাতীয় গণমুক্তি ইউনিয়ন (জাগমুই) নামে একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠায় প্রবর্তনা পেলেন। এই দল করতে গিয়ে আওয়ামী লীগের সাথে তার ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে একবার তিনি ফকিরের পুল বাজারে একটি ব্রিফকেসে ভরে নিয়ে দেবেন সিকদারকে একটি রিভলভার ও বেশ কিছু টাকা দিয়েছিলেন সংগঠনের কাজে। মাণিক চরিত্রের একটি প্রহেলিকা হলো এই জাগমুই অধ্যায়। সারাজীবন আওয়ামী লীগ করে হঠাৎ করে কেন স্বাধীন দেশে তিনি বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে একটি রাজনৈতিক দল খাড়া করতে গেলেন সেটা আমার বোধগম্য নয়। অন্যদিকে তাঁর বন্ধু ও আগরতলা মামলায় আরেক অভিযুক্ত বিধান কৃষ্ণ সেন, জাসদ নামে আরেকটি বিরোধী দল গড়তে আদাজল খেয়ে লেগে গেলেন। দুই বন্ধুর এই দুটো কাজ আমার কাছে দুর্বোধ্য রয়ে গেল।
মাণিক চৌধুরীর জীবনের আরেকটি অজানা কাহিনী হলো তাজউদ্দিন সাহেব জেলখানা থেকে মাণিক চৌধুরীর কাছে একটি চিরকুট পাঠিয়েছিলেন। ইন্দিরা গান্ধীর উদ্দেশে লেখা ঐ চিঠিতে তাজউদ্দিন পঁচাত্তরের গোলযোগপূর্ণ ঘটনাবলীর প্রেক্ষাপটে ভারতের হসত্মক্ষেপ কামনা করেছিলেন। কিন্তু জেলখানার কোনো সিপাইর মাধ্যমে পাঠানো সেই চিঠি মাণিক চৌধুরীর কাছে পৌঁছেনি। তবুও মাণিক চৌধুরী ও শামসুল হক দিল্লিতে গিয়ে ম্যাডাম গান্ধীর সাথে দেখা করার জন্য ভারতে গিয়েছিলেন। কিন্তু যেদিন তাদের যাওয়ার কথা, তার আগের রাতে মাণিক চৌধুরী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তারা দিল্লি যেতে পারলে বাংলাদেশের ইতিহাস হয়তো অন্যখাতে প্রবাহিত হতো।

 সূত্রঃ দৈনিক আজাদী



কোন মন্তব্য নেই: