মানিক চৌধুরীর মরণোত্তর সন্মাননা গ্রহণ করছেন দীপংকর চৌধুরী কাজল ২৭ ২ ২০১১ইং

রবিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১১

আগরতলা মামলার ৪২ বছর

মুহাম্মদ শামসুল হক
(শেষাংশ)
শেখ মুজিব যে স্বাধীনতার জন্য ষাটের দশকের শুরু থেকে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তার সত্যতা ১৯৬২ সালেই পূর্ব পাকিস্তান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৈরি এক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, 'পূর্ব পাকিস্তান লিবারেল পার্টির নামে যারা প্রচারপত্র বিলি করেন, তাদের একজনকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তিনি কলকাতায় গিয়ে সেখানে কয়েক ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাত করলেও তাঁর কথায় প্রকাশ হয় যে, পোস্টারগুলো (প্রচারপত্র) আওয়ামী লীগের একজন প্রাক্তন মন্ত্রী, একজন অধ্যাপক ও অন্যান্য স্থানীয় লোকজনের অনুরোধে প্রস্তুত করা হয়। সে প্রচারপত্রে নিজস্ব সেনা ও নৌবাহিনী সমেত স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রস্তাব করা হয় এবং তাতে কোন্ কোন্ ব্যক্তি শীর্ষস্থানীয় পদে আসীন হবেন তার তালিকাসহ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও সোভিয়েত ইউনিয়নের কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হয়। তা পেশোয়ারে নিয়োজিত একজন বিক্ষুব্ধ, অসন্তুষ্ট, পূর্ব পাকিস্তানী এয়ারম্যানের কাজ বলে প্রতীয়মান হয়।' তৎকালীন ছাত্রনেতা আবদুর রাজ্জাক (সাবেক মন্ত্রী ও এমপি) আমাকে (লেখক) দেয়া সাক্ষাতকারে জানিয়েছেন ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় এ রকম একটি প্রচারপত্র তিনিসহ কয়েকজন ছাত্র বিলি করেছেন।
ভয়েস অব আমেরিকাকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে (২০০৯ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে প্রচারিত) বঙ্গবন্ধুর বড় মেয়ে ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ষাটের দশকের শুরম্ন থেকে বাংলাদেশকে স্বাধীন করার একটা প্রস্তুতি বঙ্গবন্ধু শুরু করেছিলেন। যে কেন কারণে হোক সেটা সফল হয়নি।
৯৪ সালের ১০ আগস্ট লেখা ও সংবাদপত্রে প্রকাশিত এক নিবন্ধ শেখ হাসিনা লিখেছেন 'তখন রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিল। আওয়ামী লীগের সব নেতা 'এবডো' ছিলেন অর্থাৎ সক্রিয় রাজনীতিতে কেউ অংশ গ্রহণ করতে পারবেন না। তাই ছাত্রদের সংগঠিত করে আইয়ুববিরোধী আন্দোলন শুরু করা হয়। আব্বা অবশ্য আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধবদের বাড়ি বেড়াতে যেতেন বিভিন্ন জেলায়। সেখানে দলকে সংগঠিত করার কাজ ও আইয়ুববিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলার প্রস্তুতি নিতে থাকেন। বাংলাদেশকে স্বাধীন করার জন্য প্রতি জেলা, মহকুমা, থানায় গোপন সেল গঠন করেন। দেশকে স্বাধীন করার জন্য দলকে সুসংগঠিত করার কাজ গোপনে চলতে থাকে। ছাত্র আন্দোলন গড়ে ওঠে। ৬২তে বহু ছাত্র গ্রেফতার হয়। ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের বহু নেতা এ বাড়িতে এসেছেন গোপনে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ নিতে ও আলোচনা করতে।'
দেশকে স্বাধীন করার গোপন প্রস্তুতিমূলক প্রক্রিয়ায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত সামরিক বাহিনীর সাবেক সদস্য, সরকারী আমলা ও রাজনৈতিক নেতাদের অনেকেও পৃথক সাক্ষাতকারে সশস্ত্র প্রস্তুতির বিষয় আমার কাছে স্বীকার করেছেন। ইতোমধ্যে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামিদের মধ্যে যাঁরা এখনও জীবিত আছেন তাঁদের মধ্যে খান শামসুর রহমান সিএসপি, ব্রিগেডিয়ার (অব) খুরশিদ উদ্দিন, কর্নেল (অব) শওকত আলী (বর্তমানে ডেপুটি স্পীকার), কর্নেল (অব) শামসুল আলম, কমান্ডার (অব) আবদুর রউফ, নূর মোহাম্মদ বাবুল, (ক্যাপ্টেন বাবুল), করপোরাল এবিএম সামাদ, ফ্লাইট সার্জেন্ট আবদুল জলিল, মাহফুজুল বারী, ডা. ছৈয়দুর রহমান (রাজসাক্ষী), বিধান কৃষ্ণ সেন ও বৈরী সাক্ষী আবুল হোসেনের সাক্ষাতকার নিয়েছি। এ ছাড়া নিয়েছি আসামি লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেনের স্ত্রী কোহিনুর বেগম, রুহুল কুদ্দুসের ছেলে এহসান উল-আমিন, প্রয়াত মানিক চৌধুরীর স্ত্রী সবিতা চৌধুরী ও ছেলে দীপংকর চৌধুরী, সুবেদার আবদুর রাজ্জাকের স্ত্রী রিজিয়া বেগম ও ছেলে এসএম তরিকুল ইসলাম, আলী রেজার ভাই আলী নওয়াজ, সুলতান উদ্দিনের ভাই কামালউদ্দিন, ঘটনার সঙ্গে যুক্ত কিন্তু চার্জশীটভুক্ত হননি এমন ব্যক্তি সাবেক সেনা প্রধান লে. জে. মাহবুবুর রহমান, আসামি না হয়েও ১৪ মাস জেলখাটা জয়নাল আবেদীন খান, স্বাধীন বাংলা নিউক্লিয়াসের অন্যতম সংগঠক প্রয়াত জাসদ নেতা কাজী আরেফ আহমদ, আওয়ামী লীগ নেতা আবদুর রাজ্জাক, অধ্যাপক সৈয়দ ইলিয়াছ ধামী প্রমুখের সাক্ষাতকার। তাঁদের সঙ্গে কথা বলে এটা নিশ্চিত হওয়া গেছে পশ্চিম পাকিস্তানে তৎকালীন সশস্ত্র বাহিনীর বিভিন্ন বিভাগে কর্মরত কর্মকর্তা কর্মচারীরা পাকিস্তানী কর্মকর্তাদের হাতে প্রতিনিয়ত নির্যাতিত, লাঞ্ছিত, অবহেলিত, কথায় কথায় চাকরিচু্যতি, ছুটিছাঁটা বা পদোন্নতিতে বৈষম্য ইত্যাদির শিকার হচ্ছিলেন। তাঁদের মধ্যে কিছু স্বাধীনচেতা, প্রতিবাদীমনস্ক বাঙালী সামরিক-বেসামরিক ব্যক্তি এসব অন্যায় আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। তাঁরা বিক্ষিপ্তভাবে চিন্তা করতে থাকেন কীভাবে পাকিস্তানীদের অত্যাচার থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। কেউ কেউ এমনও ভাবেন যে এই অত্যাচার ও বৈষম্যের হাত থেকে বাঁচতে হলে পূর্ব বাংলাকে পশ্চিমাদের শাসনের কবল থেকে মুক্ত অর্থাৎ স্বাধীন করতে হবে। এমনকি সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে হলেও কিন্তু অল্প কয়েকজন সৈনিক বা ব্যক্তি চাইলেই তো আর স্বাধীনতা এসে যাবে না। এজন্য প্রয়োজন সাংগঠনিক শক্তি, রাজনৈতিক শক্তির সমর্থন ও সহযোগিতা এবং আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা। এ পর্যায়ে তাঁরা প্রাথমিকভাবে পাঁচ-সাতজন আলাপ আলোচনার মাধ্যমে তৎকালীন বাঙালীদের মধ্য থেকে এমন সাহসী ও যোগ্য নেতার খোঁজ করতে থাকেন যিনি সশস্ত্র প্রস্তুতির গোপন তৎপরতাসহ রাজনৈতিক সমর্থক প্রয়োজনীয় সব রকম সাহায্য সহযোগিতা দিতে পারবেন। নানা সূত্রের মাধ্যমে তাঁরা বেশ ক'জন জ্যেষ্ঠ নেতার সমর্থন চেয়ে ব্যর্থ হন। একপর্যায়ে নিশ্চিত হন যে, শেখ মুজিবই হতে পারেন তাঁদের কাঙ্কিত সাহসী, প্রতিবাদী, উপযুক্ত সংগ্রামী নেতা।
শেখ মুজিব ইতোমধ্যে অর্থাৎ '৬১ সালেই 'পূর্ব বাংলা মুক্তিফ্রন্ট' নামে একটি গোপন সংগঠনের জন্ম দেন। পাশাপাশি চলে ছাত্রদের মধ্যে সশস্ত্র ক্যাডার সৃষ্টির প্রক্রিয়া। এর অংশ হিসেবেই বঙ্গবন্ধুর তত্ত্বাবধানে ছাত্রলীগের বাছাই করা স্বাধীনতাপন্থী প্রগতিশীল বিশ্বস্ত কর্মীদের নিয়ে '৬২ সালে গঠন করা হয় 'স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ।' ১৯৬৪ সালে গঠন করা হয় স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদের 'কেন্দ্রীয় নিউক্লিয়াস'। শুরুতে এসব সংগঠনের নেতৃত্বে যুক্ত ছিলেন সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক ও কাজী আরেফ আহমদ।
ষাটের দশকের গোড়ার দিকে পশ্চিম পাকিস্তানে অবস্থানরত নৌবাহিনীর বিক্ষুব্ধ লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেমের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর পরোক্ষ যোগাযোগ শুরু হয়। '৬২ সালের শেষের দিকে করাচীতে নৌবাহিনীর কামাল উদ্দিনের টিচার্স হাউজিং সোসাইটির বাসায় এক গোপন বৈঠকে নৌবাহিনীর সদস্যরা তাঁদের মনোভাবের কথা শেখ মুজিবকে খুলে বলেন এবং তাঁর নেতৃত্ব ও পরামর্শসহ সার্বিক সাহায্য সহযোগিতা চান। ওই বৈঠকে বিক্ষুব্ধ সৈনিকদের পক্ষে তাঁদের গ্রুপ নেতা মোয়াজ্জেম হোসেন, মোজাম্মেল হোসেন, সুলতান উদ্দিন, স্টুয়ার্ড মুজিব, নূর মোহাম্মদ বাবুল (নূর মোহাম্মদ বাবুল, গোয়াল চামট, ফরিদপুর এখনও জীবিত) প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। শেখ মুজিব তাঁদের মনোভাব জেনে নিজেরও একই মনোভাব ও পরিকল্পনার কথা জানান। তিনি বলেন, 'স্বাধীনতার জন্য আমি আমার শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত দিতে রাজি আছি। আপনাদের যখন যে রকম সাহায্য সহযোগিতা প্রয়োজন তা আমি দেব।' এ ছাড়া স্বাধীনতার আন্দোলনকে রাজনৈতিকভাবে জনপ্রিয় করার ব্যাপারে ছাত্রদের দায়িত্ব দেয়া হবে বলে তিনি তাঁদের আশ্বস্ত করেন। একই সঙ্গে তিনি দেশপ্রেমিক সৈনিকদের সুসংগঠিত হওয়ার পরামর্শ দেন। তার আগে অর্থাৎ লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেমের প্রাথমিক যোগাযোগের পর বঙ্গবন্ধু রুহুল কুদ্দুসসহ কয়েকজন অতি বিশ্বস্ত লোক নিয়ে বিষয়টি পর্যালোচনা করে চূড়ান্তা সিদ্ধান্ত নেন। সমস্ত বিষয়ে সর্বোচ্চ গোপনীয়তা বজায় রাখার সিদ্ধান্ত হয়। এরপর থেকে নৌ, বিমান ও সেনা সদস্যরা তাঁদের বিশ্বস্ত লোকজন নিয়ে ধীরে ধীরে পৃথক পৃথক গ্রুপ সৃষ্টির মাধ্যমে সংগঠিত হতে থাকেন। ১৯৬৬ সালের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন গ্রুপের নেতা ও সদস্যরা করাচীতে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর বাসভবন, লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেমের করাচী ও চট্টগ্রামের নেভাল এ্যাভিনিউর বাসা, কামাল উদ্দিনের বাসা, আহমদ ফজলুর রহমান ও রুহুল কুদ্দুসের বাসা, ঢাকায় তাজউদ্দীন আহমদের বাসা, চট্টগ্রামে ভূপতিভূতিভূষণ চৌধুরী (মানিক চৌধুরী)র রামজয় মহাজন লেন, ডা. ছৈয়দুর রহমানের এনায়েত বাজার আউটার হাউস এবং বিধান সেনের মিরেন্ডা লেনের বাসা, হোটেল মিসকা, হোটেল শাহজাহান, পাঁচলাইশের পিআইএ হাউসসহ বিভিন্ন স্থানে একাধিক বৈঠকে মিলিত হন। বেশ কটি বৈঠকে বঙ্গবন্ধু সরাসরি উপস্থিত ছিলেন। তবে নিরাপত্তা, গোপনীয়তা ইত্যাদি বিষয় বিবেচনা করে বঙ্গবন্ধু কেবল নির্দিষ্ট কয়েকজন ছাড়া অন্যদের সঙ্গে সাক্ষাত দিতেন না। এমনকি আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগ-যুবলীগের তৎকালীন নেতৃত্বকে পর্যন্ত এই গোপন প্রক্রিয়ার কথা জানানো বারণ ছিল। কারণ কোনো কারণে ঘটনা ফাঁস হলে সবাইকে ফাঁসিতে ঝুলতে হবে এবং বাঙালীদের মুক্তি আন্দোলন অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে। বিপ্লবী সংগঠনের সূচনাকালীন ও গোপন বিপ্লবী কাউন্সিলের একমাত্র জীবিত সদস্য নূর মোহাম্মদ বাবুল জানিয়েছেন ১৯৬৬ সালে ছয় দফা ঘোষণার পর করাচীতে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর বাসভবনের সামনে ট্যাক্সি দুর্ঘটনার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু তা সফল হয়নি। বঙ্গবন্ধু তাঁর পক্ষে সৈনিকদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য চট্টগ্রামের মানিক চৌধুরীকে মনোনীত করেন। পরে ডা. ছৈয়দুর রহমান ও বিধান কৃষ্ণ সেনকেও নির্বাচিত করা হয়। বঙ্গবন্ধু তাঁর বিশ্বস্ত বেশ কয়েকজন সিএসপি কর্মকর্তা যেমন রুহুল কুদ্দুস, আহমদ ফজলুর রহমান, খান শামসুর রহমান প্রমুখের সঙ্গেও স্বাধীনতা অর্জনের প্রয়োজন এবং সৈনিকদের সহযোগিতার ব্যাপারে আলোচনা করতেন। মানিক চৌধুরী শেখ মুজিবের পক্ষে অনেক সময় খবরাখবর জানাতেন বেগম মুজিবকে।
বঙ্গবন্ধুর পরামর্শ অনুযায়ী কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেনের নেতৃত্বাধীন সৈনিক গ্রুপের সঙ্গে সিএসপি কর্মকর্তাদেরও একাধিক বৈঠক হয় করাচী, ঢাকা ও চট্টগ্রামে। সংশ্লিষ্ট সবাই স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রস্তুতির কথা জানলেও এর বাস্তবায়নের প্রকৃত কৌশল সম্পর্কে সবাই পুরোপুরি জানতেন না। সংশ্লিষ্ট বেশিরভাগই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কথাবার্তা ও তাঁর কার্যক্রমে বুঝতে পেরেছিলেন যে, তাঁর মূল (বঙ্গবন্ধুর) লক্ষ্য ছিল, সকল প্রগতিশীল স্বাধীনচেতা শক্তির সম্মিলন ঘটিয়ে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে স্বাধীনতার পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টি করা। তবে এ পর্যায়ে সরকারের দিক থেকে সশস্ত্রভাবে বাধাবিঘ্ন এলে সশস্ত্র উপায়েই তা মোকাবেলার মাধ্যমে দেশকে স্বাধীন করার প্রস্তুতি নিতে হবে।
কিন্তু চারদিকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শেষ হওয়ার আগেই নানা কারণে পাকিস্তানী গোয়েন্দা সংস্থার কাছে বিষয়টি ফাঁস হয়ে যায়। মামলা চূড়ান্ত করার আগেই শেখ মুজিবকে জেলে আটক রাখা হয়। পরে একে একে গোপন প্রক্রিয়ায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত তিন হাজারের (কারও মতে ৪ থেকে ৫ হাজার) বেশি লোককে গ্রেফতার করা হয়। এর মধ্যে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত হিসেবে চিহ্নিত ৩৫ জনকে চার্জশীটভুক্ত আসামি এবং ১১ জনকে রাজসাক্ষী করে 'রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য' শিরোনামে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দায়ের করা হয়, যা 'আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা' নামে পরিচিতি পায়। ১৯৬৮ সালের ১৯ জুন শুরু হওয়া এই মামলায় মোট ২০০ সামরিক বেসামরিক ব্যক্তিকে সাক্ষী হিসেবে দেখানো হয়। চার জন সাক্ষী মামলার জেরাকালে অভিযোগ অস্বীকার করলে বৈরী ঘোষণা করা হয় তাঁদের। মামলার প্রধান অর্থাৎ এক নম্বর আসামি ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান এবং দুই নম্বর আসামি ছিলেন লে. ক. মোয়াজ্জেম হোসেন।
আগরতলা মামলায় মাত্র ৩৫ জনকে আসামি করা হলেও এতে বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে সরাসরি যুক্ত এবং তাঁদের নানাভাবে সহযোগী হিসেবে জড়িত সদস্য সংখ্যা পাঁচ হাজারের ওপরে হবে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন। তাঁদের অনেকে বিনা বিচারে এক থেকে দেড় বছর জেল খেটেছেন, নির্যাতন ভোগ করেছেন। কিন্তু মামলায় অভিযুক্ত করার মতো পর্যাপ্ত সাক্ষী প্রমাণের অভাবে তাঁদেরকে আসামি হিসেবে দেখানো হয়নি এবং অভিযোগপত্রও সেভাবে দেয়া হয়নি। শেষ পর্যন্ত মামলা প্রত্যাহার করা হলে সংশ্লিষ্ট সবাই জেল থেকে মুক্তি পান।
সংশ্লিষ্টদের কাছে জানা গেছে, প্রথম দিকে চার পাঁচজন করে এক একটা গ্রুপ বিপ্লবী প্রক্রিয়ায় যাত্রা শুরু করলেও ঘটনা ফাঁস হওয়ার আগে পর্যন্ত বিভিন্ন গ্রম্নপের সংস্পর্শে এসে পাঁচ হাজারের বেশি সামরিক ও বেসামরিক ব্যক্তি তাঁদের সদস্য হয়েছিলেন। এঁদের মধ্যে রয়েছেন প্রাক্তন সেনাপ্রধান লে. জে. মাহবুবুর রহমান, আসামি আলী রেজার ভাই আলী নওয়াজ এবং আসামির তালিকাভুক্ত না হয়েও ১৪ মাস জেল খাটা জয়নাল আবেদীন খান। এ ছাড়া অভিযোগপত্র পর্যালোচনায়ও দেখা যায়, অভিযুক্তদের সঙ্গে বিভিন্ন বৈঠকে এমন অনেকেই উপস্থিত ছিলেন যাঁদের নাম পরিচয় তদন্তকারীরা উদ্ধার করতে পারেনি।
বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ভারতের সহযোগিতায় সংশ্লিষ্টরা বাংলাদেশকে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন তথা স্বাধীন করতে চায় এমন স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য পাকিস্তানী সেনা কর্মকর্তারা গ্রেফতারকৃতদের ওপর সীমাহীন নির্যাতন চালায়। ভারতের সহায়তায় পাকিস্তান ভাঙার ষড়যন্ত্রের কথা শুনে পূর্ব বাংলার মানুষ শেখ মুজিবসহ স্বাধীনতাকামীদের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠবে এবং এতে শেখ মুজিবকে ফাঁসিতে ঝোলানোর মাধ্যমে স্বাধীনতা আন্দোলন চিরতরে সত্মব্ধ করে দেয়া যাবে এই ধারণা থেকে সরকার মামলাটিকে 'আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা' হিসেবে প্রচার করে। কিন্তু বাঙালীরা সরকারের ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেন শেখ মুজিবসহ সবার নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে ব্যাপক গণআন্দোলনের মাধ্যমে। অবশেষে গণবিস্ফোরণের মুখে উপায়ান্তর না দেখে সরকার মামলা প্রত্যাহারে বাধ্য হয় এবং বঙ্গবন্ধুসহ সব বন্দী '৬৯-এর ২২ ফেব্রুয়ারি জেল থেকে মুক্তি পান। মুক্তির পর ২৩ ফেব্রুয়ারি ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ আহূত সমাবেশেই শেখ মুজিব বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত হন।
স্বাধীনতা সংগ্রামীদের কার্যক্রমের জন্য যে টাকা পয়সার দরকার তা নানা উৎস থেকে পাওয়া যেত। এসব উৎস মূলত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আগ্রহেই সৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম উৎস ছিলেন চট্টগ্রামের মানিক চৌধুরী (চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন কোষাধ্যক্ষ)।
আগরতলা মামলা পাকিস্তানের কাছে ষড়যন্ত্রমূলক মনে হলেও বাঙালীদের কাছে তা ষড়যন্ত্রমূলক কর্মকা- হিসেবে কিছুতেই গণ্য হতে পারে না। বরং এটা ছিল বাংলাদেশকে স্বাধীন করার লক্ষ্যে বাঙালীদের সংগ্রামী যাত্রাপথের একটি গৌরবময় অধ্যায়। এই মামলার মাধ্যমে পাকিস্তানীরা বঙ্গবন্ধুসহ শীর্ষস্থানীয় বাঙালী সামরিক বেসামরিক লোকদের হত্যা করতে চেয়েছিল ঠিকই। কিন্তু এই মামলাকে কেন্দ্র করেই ১৯৬৯-এ যে গণআন্দোলনের সূচনা হয় তার ফলে শাসকগোষ্ঠী সব আসামিকে মুক্তি দিয়ে মামলা প্রত্যাহারে বাধ্য হয়। অপরদিকে এই মামলার কার্যক্রম ও ঘটনাবলী বাঙালীদের আর গোপনে নয়, প্রকাশ্যে স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতার দাবি তুলতে উদ্বুদ্ধ করে। এ ধারাবাহিকতাই বাঙালীর গণজাগরণের ফলে '৭০-এর নির্বাচনে জনগণ বঙ্গবন্ধুর দল আওয়ামী লীগকে নিরঙ্কুশ রায় দেয়। এই রায় মেনে নিতে শাসকগোষ্ঠী অস্বীকার করায় মানুষ প্রকাশ্যেই স্বাধীনতার দাবিকে সামনে আনে, যার পরিণতি '৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ ও চূড়ান্ত পর্যায়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা। (সমাপ্ত)

লেখক : 'স্বাধীনতার সশস্ত্র প্রস্তুতি-আগরতলা মামলার অপ্রকাশিত জবানবন্দি' গ্রন্থের লেখক ও সাংবাদিক 

কোন মন্তব্য নেই: