Tuesday, August 4, 2009
মুক্তিযুদ্ধে পটিয়া : খন্ডিত কিছু স্মৃতি
বাঙালি জাতির ইতিহাসে যে ক’টি বীরত্ব গাঁথা রয়েছে সে সবের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ বীরত্বগাঁথা ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ। পৃথিবীর খুব কম জাতি রয়েছে, যারা ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছে, স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধে যারা অকাতরে প্রাণ দিয়েছিলেন, তাঁদের সুবাদেই বাঙালি জাতি শত শত বছর পরাধীনতার শৃঙ্খলে থাকার পরও বীরের জাতিতে পরিণত হয়েছিল।
এই মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে বীর প্রসবিনী পটিয়া। বৃটিশ শাসনামল হতে শিক্ষা দীক্ষায় প্রাগ্রসর পটিয়া মুক্তিযুদ্ধের সময়ও ছিল অগ্রভাগে। বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা, বাংলাদেশের স্থপতি, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অন্যতম তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামী বিভূষি ভূষণ চৌধুরী প্রকাশ মানিক চৌধুরী ছিলেন পটিয়ার হাবিলাসদ্বীপ গ্রামের সূর্যসন্তান (এই সূর্য সন্তানের জন্য আমরাও গর্বিত)।
১৯৭০ সালের জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী অধ্যাপক নুরুল ইসলাম চৌধুরী ও সুলতান কুসুমপুরী বিজয়ী হওয়ার পর হতেই মূলত ঐতিহাসিক পটিয়া আন্দোলন সংগ্রামে মুখরিত হয়ে উঠে। আমার স্পষ্ট মনে আছে নির্বাচনে বিজয়ের পর আমাদের হুলাইন গ্রাম হতে বের করা একটি মিছিল বড়দের সাথে আমরা পিচ্ছিরাও সামিল হয়েছিলাম। যে মিছিলের শ্লোগান ছিল ‘‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’’, ‘‘সাত তারিখে জিতলো কে, নৌকা-নৌকা’’, ‘‘সতের তারিখ জিতলো কে, নৌকা-নৌকা’’, ‘‘ইয়াহিয়ার মুখে লাথি মারো পূর্ববাংলা স্বাধীন করো’’।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের সেই কালো রাতে যখন বর্বর পাকিস্তানী সেনাবাহিনী অপারেশন সার্চলাইটের নামে ঢাকায় নিরস্ত্র প্রতিরোধের পরিকল্পনা প্রণয়ন করা। ২৬ মার্চ চট্টগ্রাম (আগ্রাবাদ) বেতার কেন্দ্র হতে প্রথমে এম এ হান্নান ও পরে ২৭ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়া বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করলে পটিয়াবাসী তথা সারা দেশের মানুষ উজ্জীবিত হয়। সেদিন ঝাউতলা রেলস্টেশনসহ চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে বিহারী কর্তৃক বাঙালি নিধনের সংবাদেও পটিয়াবাসী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে শুরু করে। পটিয়ার জাতীয় পরিষদ সদস্য অধ্যাপক নুরুল ইলাম চৌধুরী, পূর্ণেন্দু দস্তিদার, চৌধুরী হারুনুর রশিদ, আবুল মাসুদ চৌধুরী, নুরুন্নবী, অধ্যক্ষ নুর মোহাম্মদ, শামসুদ্দিন আহমদ, নুরুল ইসলাম চৌধুরী, অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন দাশ, অধ্যাপক শামসুল ইসলামসহ আরও অনেকের নেতৃত্বে পটিয়াবাসী মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করে।
পটিয়ার সর্বস্তরের জনতা সেদিন পূর্ববাংলার স্বাধীনতার নেশায় উম্মাদ হয়ে উঠে। হাজার হাজার ছাত্র-জনতা ভারতে গিয়ে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়। অনেকে দেশের অভ্যন্তর থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করে। মুষ্ঠিমেয় কিছু স্বাধীনতা বিরোধী থাকলেও মূলত: পটিয়া ছিল স্বাধীনতাকামী মুক্তি পাগল জনতার দুর্ভেদ্য দূর্গ। সম্ভবত একমাত্র পটিয়া’ই ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত হানাদার মুক্ত তথা স্বাধীন ছিল।
পটিয়াবাসীর রাজনৈতিক সচেতনতা ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নেয়ার কথাটি বুঝতে পেরে যুদ্ধের প্রথমদিকেই পাকিস্তানী বিমানবাহিনী ১৪ এপ্রিল শুক্রবারে পটিয়া সদরে ব্যাপক বোমাবর্ষণ করে। সেদিন প্রায় অর্ধশতাধিক লোক শহীদ হন। যুদ্ধের শুরুতে পাকিস্তানী বাহিনীর এই বর্বরতা পটিয়াবাসীকে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে অনুপ্রেরণা জোগায়।
মুক্তিযুদ্ধে শুরুতে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠকারী মেজর জিয়াউর রহমান ও তৎকালীন পটিয়ার সন্তান ক্যাপ্টেন অলি আহমদ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র পতনের পর পটিয়ার হাবিলাসদ্বীপ ইউনিয়নের হুলাইন গ্রামের আমিন শরীফ চৌধুরী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিশ্রাম নিয়েছিলেন বলে জানা যায়। স্বাধীনতা যুদ্ধের বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ক্যাপ্টেন অলি আহমদ ‘বীর বিক্রম’ উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন। পটিয়ার বীর মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকদের মধ্যে অনেকের নাম আজ মনে না থাকলেও কিছু মুক্তিযোদ্ধার ও সংগঠকের নাম আজও স্মৃতিতে জ্বল জ্বল করছে। তাদের মধ্যে এডভোকেট জালালউদ্দিন আহমদ চৌধুরী, এস এম ইউসুপ, আহমদ শরীফ মনির, ধীরেন দাশ, মোহাম্মদ মহসিন, আহমদ নবী, মাহফুজুর রহমান খান, আবদুস ছালাম, শামসুদ্দিন আহমেদ, আবদুল বারিক, প্রফেসর শামসুল ইসলাম, নুরুল ইসলাম চৌধুরী, নাসিরুদ্দিন চৌধুরী, ফজল আহমদ চৌধুরী, দীলিপ কান্তি দাশ, শাহ আলম, অনিল নালা, আবুল কাশেম, ফজলুল হক, আবদুস শুক্কুর, আবু তাহের বাঙালি, মুক্তিমান বড়ুয়া, মাওলানা এমদাদ, ফজল আহমদ, নূর মোহাম্মদ, শহীদ সুবেদার আবদুস ছালাম, মরহুম মোজাহেরুল হক, আ.জ.ম. সাদেক, কাজী আবু তৈয়ব, মহিউদ্দিন, একেএম আবদুল মতিন, প্রদ্যুৎ পাল, চৌধুরী মাহবুব, ইউসুপ খান, শিরু বাঙালি, আবদুস ছবুর, মোহাম্মদ আসলাম, মো: রফিক খান, রফিক আহমদ, ফেরদৌস চৌধুরী, আবু তাহের, সোলেমান কমান্ডার, সোলায়মান খান, আবদুল হক, স্বপন চৌধুরী, আবুল হাশেম মাস্টার প্রমুখের নাম উল্লেখ্যযোগ্য।
চট্টগ্রামের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ক্যাপ্টেন করিমের নাম অবিস্মরণীয় হয়ে আছে। তিনি পটিয়ার অধিবাসী না হলেও মুক্তিযোদ্ধাদের শ্রদ্ধার নাম ছিলেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে তিনি বিজয়ের পূর্ব মুহূর্তে শহীদ হয়েছিলেন। বিনিনেহারার ডা. শামসুল আলম ও গৈড়লার আহমদ হোসেন মাস্টার মুক্তিযোদ্ধাদের যাবতীয় সহায়তা করতেন বলে জানা যায়। এ দু’জনের বাড়ি মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাঁটি হিসেবে সুপরিচিত ছিল।
পটিয়ার মুক্তিযুদ্ধে মিলিটারী পুলের পাক বাহিনীর সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মুখ যুদ্ধের কথা মনে হলে আজও গা শিউরে উঠে। সেপ্টেম্বর সংঘটিত এই যুদ্ধে উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন হতাহত হয়েছিলেন। পাকিসত্মানীদের অত্যাধুনিক অস্ত্রের আক্রমনের মুখে পেরে না উঠে মুক্তিযোদ্ধাদের শেষ পর্যমত্ম পিছু হটেছিলেন, সে যুদ্ধে হুলাইনের সোলেমান কমান্ডার, সোলায়মান খানসহ ১৫ জন মুক্তিযোদ্ধা অংশ নিয়েছিলেন। যুদ্ধের পর পাকিস্তানী বাহিনী ক্রোধান্বিত হয়ে পুরো সেনেরহাট জ্বালিয়ে দেয় এবং হাবিলাসদ্বীপ গ্রামের শত শত হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ঘর বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়। সেদিন হানাদার বাহিনীর সাথে দেশীয় অনেক রাজাকারও অংশ নিয়েছিল বলে জানা যায়। সেদিন চরকানাই ফুলতলে হুলাইনের শামসুল আলম পাকিস্তান বাহিনীর হাতে শহীদ হন।
পটিয়ার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে মোজাফফরাবাদ হত্যাকান্ড বেদনার স্মৃতি হিসেবে আজীবন সকলের মনে থাকবে। পাকিস্তানী আর্মি মোজাফফরাবাদে সেদিন শতাধিক বাড়ি জ্বালিয়ে দেয় এবং অর্ধশতাধিক হিন্দু ধর্মাবলম্বী লোককে হত্যা করেছিল। পটিয়ার মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় স্মৃতি হয়ে আছে ধলঘাট, গৈড়লার টেক ও জিরি মাদ্রাসার যুদ্ধ। যে যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের পাক হানাদার বাহিনী ও রাজাকারদের সন্ত্রস্থ করতে পেরেছিলেন। পটিয়ার মুক্তিযোদ্ধারা খাসমহল আক্রমন করে জ্বালিয়ে দিয়েছিল। আক্রমন করেছিলেন লাখেরার ওয়্যারলেস সেন্টার। মনসার টেকে রাজাকার কর্তৃক স্বাধীনতাকামী নিরীহ মানুষকে হত্যার ঘটনা যুদ্ধের বেদনাবহ স্মৃতির অন্যতম।
মুক্তিযুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ের একদিন সকালে হুলাইন গ্রামের মানুষ হতচকিয়ে গিয়েছিল। কেননা এর আগের দিন রাত্রে গ্রামের প্রায় কয়েক’শ কিশোর-তরুণ একযোগে যুদ্ধে অংশ নেয়ার উদ্দেশ্যে প্রশিক্ষণের জন্য ভারতের উদ্দেশ্যে গ্রাম ছেড়েছিল। এতগুলো ছেলের একযোগে গ্রাম ত্যাগে পুরো গ্রাম জুড়ে কান্নার রোল উঠেছিল। যাকে ঐতিহাসিক ঘটনা বলে চিহ্নিত করা যায়। সেদিন যারা যুদ্ধে যাওয়ার জন্য বেরিয়ে ছিল তাদের মধ্যে নুরুল হাকিম, মরহুম কিবরিয়া, ইউসুপ খান, মরহুম হারুনুর রশিদ, সাইফুল্লাহ রফিক, আনোয়ারুল ইসলাম, হারুন খান, নুরু, সোলায়মান খান প্রমুখের নাম এখনও মনে আছে। সেদিন তাদের সাথে আমার অগ্রজ মরহুম শফি খানও চলে গিয়েছিলেন। দুর্ভাগ্যজনক সত্য হলো তাদের অনেকেই মুক্তিযোদ্ধার সনদপত্র যোগার করতে পারেনি।
হুলাইন গ্রামের তৎকালীন ছাত্রলীগের সদস্য মুজিবুর রহমান খান (বর্তমানে এডভোকেট) সেদিন মুক্তিযোদ্ধাদের ইনফরমার তথা সহায়তাকারী হিসেবে কাজ করেছিলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সর্বতোভাবে সহায়তা করতেন মরহুম আ.জ.ম. নুরুল আলম মাস্টার, মোজাফফর আহমদ, নেছার আহমদ চৌধুরী, জাফর আহমদ চৌধুরী ও মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী প্রমুখ।
মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে একজন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার সেবাশুশ্রুষা করার আমার নিজেরও হয়েছিল। বাবার সাথে পরিচয়ের সুবাদে পার্শ্ববর্তী বোয়ালখালী থানার খিতাপচর গ্রামের আলতাফ নামের একজন ইপিআর সদস্য মুক্তিযোদ্ধা পার্বত্য অঞ্চলে সম্মুখ যুদ্ধে গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন। পরবর্তীতে তাঁকে গোপনে চিকিৎসা দিয়ে কিছুটা সুস্থ হলে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু নিজ বাড়িতে তিনি নিরাপদ না হওয়ায় বাবা তাঁকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসেন। আমাদের নির্মাণাধীন মাটির দালানের দোতলায় তিনি থাকতেন। সেখানেই তার খাওয়া দাওয়া হতো। রাত্রে তিনি আমাদেরকে নিয়ে অল্পক্ষণের জন্য বের হতেন। সে সময় তার কাছে মুক্তিযুদ্ধের অনেক গল্প শুনতাম (জানি না আজ কোথায়)। তিনি প্রায় ২০ দিন থাকার পর সুস্থ হয়ে চলে গিয়েছিলেন।
১৬ ডিসেম্বর যখন পাকিসত্মানী বাহিনী রেসকোর্স ময়দানে মুক্তি ও মিত্রবাহিনীর প্রধান জগজিৎ সিং অরোরার নিকট আত্মসমর্পণ করে, তখন সারাদেশের মতো পটিয়াতেও আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। পটিয়ার সর্বত্র বিজয় দিবস উদযাপিত হয়। বিজয় দিবস উদযাপনের অংশ হিসেবে ১৭ ডিসেম্বর আমাদের এলাকায় হাবিলাসদ্বীপ হাই স্কুলের মাঠে মুক্তিযোদ্ধারা বিজয় দিবস উদযাপন করেন। তিনটি এলএমজির সাহায্যে ফাঁকা গুলি ছুড়ে সেদিন উৎসবের সূচনা করা হয়েছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের ‘জয় বাংলা’, ‘তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনা’, ‘জেলের তালা ভাঙ্গবো শেখ মুজিবকে আনবো’ ইত্যাদি শ্লোগানে মুখরিত হয়েছিল সারা গ্রাম। সেদিন বোয়ালখালী হতে গ্রেফতারকৃত ১৭ জন পাকিসত্মানী সৈন্যকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল, যাদেরকে মুক্তিযোদ্ধারা গ্রেফতার করে নিয়ে এসেছিলেন। (লেখক: মুহাম্মদ মুসা খান)
সূত্রঃ পটিয়া ওয়েব
