তপন কুমার দে
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামি ছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অন্যতম সহযোগী চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনের প্রবাদপুরুষ জহুর আহমেদ চৌধুরীর অন্যতম সহযোগী ভূপতিভূষণ চৌধুরী ওরফে মানিক চৌধুরী।
চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনে অন্যতাম সিংহপুরুষ বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক চৌধুরী ১৯৩০ সালের ১৬ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের পটিয়া থানার হাবিলসদ্বীপ গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ধীরেন্দ্র লাল চৌধুরী এবং মাতার নাম যশোদা বালা চৌধুরী। চট্টগ্রাম শহরের রামজয় মহাজন লেনের পৈত্রিক বাড়ি থেকে লেখাপড়ার হাতেখড়ি। ছোটবেলা থেকে তিনি খুবই মেধাবী ছাত্র ছিলেন, যা প্রতিনিয়ত প্রমাণ করেছেন মানিক চৌধুরী। চট্টগ্রামের মিউনিসিপ্যাল স্কুল থেকে ইংরেজিতে লেটারসহ প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাশ করে কলকাতা যান পড়াশোনা করতে। বঙ্গবাসী কলেজে অধ্যয়নরত অবস্থায় রাজনীতির হাতেখড়ি এবং ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে যোগ দেন। আইএ পাশ করেন প্রথম বিভাগে।
ইতোমধ্যে পিতার মৃত্যুতে দেশে ফিরে আসেন এবং লেখাপড়ার ইতি ঘটিয়ে পারিবারিক ব্যবসা-বাণিজ্যে আত্মনিয়োগ করেন। মানিক চৌধুরীর প্রকৃত নাম ভূপতিভূষণ চৌধুরী। জমিদার ধীরেন্দ্র লাল চৌধুরীর একমাত্র ছেলে ছিলেন তিনি। প্রফুল্ল চৌধুরী ও তেজেন্দ্র চৌধুরী তার পিতৃব্য। তিনি অল্প বয়সে পিতৃহীন হন। প্রফূল্ল চৌধুরীর কোন ছেলে সন্তান ছিল না। তাদের পুরনো গদি ছিল খাতুনগঞ্জে। পরে তারা সত্যেন্দ্র কবিরাজের বিল্ডিং খরিদ করে আছাদগঞ্জে তথা পোস্ট অফিসের গলির মুখে চলে আসেন। বাবার মৃত্যুর পর প্রকৃতপক্ষে কাকার স্নেহ-ভালবাসাতেই তিনি বড় হন।
তিনি ছিলেন আজীবন অসম্প্রদায়িক প্রগতিশীল চিন্তা চেতনার মানুষ। অন্যান্য হিন্দুদের মতো দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া বা একই সঙ্গে ভারত পাকিস্তানের নাগরিক হওয়ার মতো সুবিধাবাদী কখনও তিনি ছিলেন না। বিপুল অর্থ উপার্জন করতেন আর খরচ করতেন দু’হাতে। সেজন্য বিপুল আয় সত্ত্বেও লাগামহীন ব্যয়ের কারনে তার কোন আপসোসও ছিল না। তিনি বেহিসেবী ও বেপরোয়া জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন। জন এফ কেনেডি যাকে ঝুকিঁর মুখে সাহসিকতা বলেছেন তা তার মধ্যে পুরোপুরি বিদ্যমান ছিল। বিপদে বিচলিত হয়েছেন কদাচিৎ । মনেপ্রাণে ভালবাসতেন বাংলাদেশকে। তাই সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কলকাতা বা বাংলাদেশের বাইরে কোন সম্পত্তি অর্জন করেন নি। জেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ ছিলেন তিনি। ১৯৬৬ সালের পূর্ব পর্যন্ত তার পরিবার ও তিনি আওয়ামী লীগের কত উপকার করেছেন তার কোন হিসেব নেই। ১৯৬৪ সালে আছাদগঞ্জে রামজয় মাহজন লেনে সর্বদলীয় এক মিছিলে মুসলিম লীগের গুণ্ডারা হামলা চালালে এমএ আজিজ, এমএ মান্নান, ছাত্রলীগের সিটি শাখার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারী আবুল কালাম আজাদ সহ অনেকে মারাত্মকভাবে আহত হন। গুণ্ডারা হাফেজ মো. শরীফ এবং নূর মোহাম্মদ এর কান কেটে দেয়। এমএ আজিজ তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা বিভূতিভুষণ চৌধুরীর( মানিক চৌধুরী) বাসায় আশ্রয় নেন। এ সময় গুণ্ডাদের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য মানিক চৌধুরীর মা নিজের গলার সোনার চেইন ছিঁড়ে রাস্তায় ছুঁড়ে মারেন। গুণ্ডারা সোনার চেইনের বিচ্ছিন্ন টুকরাগুলো খুঁজে নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়লে এমএ আজিজ তাদের আক্রমণ থেকে প্রাণে রক্ষা পান।
রাজনীতি করতে গিয়ে তিনি গাঁটির পয়সা খরচ করেছেন, রাজনীতি থেকে কোন ফায়দা আদায় করেননি। একান্নবর্তী পরিবারের সদস্য ছিলেন, ঝড়ঝাপটা সব গেছে পরিবারের ওপর দিয়ে। তার সঙ্গে জহুর আহমদ চৌধুরীর সম্পর্ক ছিল সহোদর ভ্রাতার মতো।
১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের অল্পকাল পরে শ্রী চৌধুরী মওলানা ভাসানীর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে আসেন এবং পরবর্তীতে মুসলিম লীগবিরোধী অসাম্প্রদায়িক আন্দোলনে যোগ দেন। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকে তিনি এ সংঘঠনের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েন এবং মরহুম এমএ আজিজ, মরহুম জহুর আহমদ চৌধুরীর সঙ্গে একত্রে চট্টগ্রামে সংগঠন গড়ে তোলার কাজে ব্যাপৃত হন। ৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনকালীন শ্রী চৌধুরী এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং মরহুম হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সংস্পর্শে আসেন। এ সময়ই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তার প্রগাঢ় বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে এবং জেলা আওয়ামী লীগের কোষঅধ্যক্ষ হিসেবে নির্বাচিত হন। ৬২ সালের সামরিক আইনবিরোধী আন্দোলনসহ গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল আন্দোলন বিশেষ করে ৬ দফা আন্দোলনে তার ভূমিকার জন্য তিনি চট্টগ্রামের রাজনীতিতে অন্যতম মুখ্য ব্যক্তিতে পরিণত হন। ১৯৬৬ সালের ২০মে রাতে পাকিস্তান প্রতিরক্ষা আইনে তাকে গ্রেফতার করা হয় এবং তথাকথিত আগরতলা ষড়যস্ত্র মামলায় জড়িত করে তার বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার অভিযোগ আনা হয়। তাকে কারাগারে চরমভাবে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে তিনি আবার মুক্তি পান কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যে ইয়াহিয়ার সামরিক জান্তা তাকে আবার গ্রেফতার করে। ৭০-এর শেষ দিকে জেল থেকে ছাড়া পান। স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনে সক্রিয় অংশ নেন। মুক্তিযুদ্ধকে সংগঠিত করার কাজে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন।
মানিক চৌধুরী বিডিও হয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৬৫ সালে জহুর আহমদ চৌধুরী জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে পরাজিত হলে মানিক চৌধুরী তার আইডেন্টিটি কার্ড টুকরো টুকরো করে ছুঁড়ে ফেলে দেন। সেদিন যারা বিডি হিসেবে জহুর আহমদ চৌধুরীর বিরোধীতা করেছে আজ তাদের অনেকেই আওয়ামী লীগ নেতা ও রাষ্ট্রদূত। মানিক চৌধুরী কখনও সে রকম করেননি। সুদিনে-দুর্দিনে তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর নিত্যসঙ্গী।
এখানে উল্লেখ্য, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ আওয়ামী লীগের সে যুগের তিনজন প্রভাবশালী নেতা ডা. সাইদুর রহমান চৌধুরী ( সহ-সভাপতি, চট্টগ্রাম সিটি আওয়ামী লীগ), ভূপতি ভূষণ চৌধুরী ওরফে মানিক চৌধুরী( কোষাধ্যক্ষ, চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগ), বিধান কৃষ্ণ সেনকে ( সাংগঠনিক সম্পাদক , চট্টগ্রাম শহর আওয়ামী লীগ) গ্রেফতারপূর্বক অভিযুক্ত করা হয়েছিল। বাংলাদেশের আর কোথাও কোন আওয়ামী লীগ এবং তার সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগের কোন কর্মীকে তথাকথিত আগরতলা মামলায় পাকিস্তান সরকার অভিযুক্ত করেনি। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধু, চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের তিন নেতা, সিভিল সার্ভিস ও সেনাবাহিনীসহ মোট ৩৫ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল।
তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি ও চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে খ্যাত ডা. সাইদুর রহমান চৌধুরী, মানিক চৌধুরী ও বিধান কৃষ্ণ সেনের নিয়মিত আড্ডা ছিল চট্টগ্রাম স্টেশন রোডের রেস্ট হাউজের ২৩ নং রুমে।
বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামের ধারাবহিকতায় মূলত ১৯৬২ সালের আইয়ুবের সামরিক শাসন বিরোধী এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মুক্তি আন্দোলনের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানে নবজাগরনের সূত্রপাত ঘটে। আর ১৯৭০ এর সাধারণ নির্বাচন এবং ১৯৭১-এর রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার দ্বারাই এ আন্দোলনের সফল পরিসমাপ্তি ঘটে। সে সময়কার ছাত্র-জনতার সব মিছিলে নেপথ্যে সহায়তা প্রদানকারী ছিলেন মানিক চৌধুরী। এমনকি কোন সময় মানিক চৌধুরী মিছিলের অগ্রভাগে থেকে আবার কোন সময় মিছিলের শেষভাগে থেকে সবাইকে উৎসাহ জোগাতেন। রাজনৈতিক মিটিং- মিছিল শেষে বাণী কোম্পানির ( লালদীঘির সোনালী ব্যাংকের কাছে) মাইকের খরচ, কর্মীদের আপ্যায়ন, প্রচারকার্যে ব্যবহৃত ঘোড়ার গাড়ি ও বেবিট্যাক্সির ভাড়া দেয়ার জন্য যখন সব নেতাকর্মী বিব্রতকর অবস্থায় পড়তেন তখনই দেখা যেত ঘটনাস্থলে মানিক চৌধুরী এসে তার সহজ-সরল সমাধান করে দিতেন।
স্বাধীনতা- উত্তর সময়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তার রাজনৈতিক মতপার্থক্য ঘটে এবং তিনি নতুন দল জাতীয় গণমুক্তি ইউনিয়ন( জাগমুই) প্রতিষ্ঠায় কার্যকর ভূমিকা পালন করেন। বিশেষ ক্ষমতা আইনের আওতায় তাকে ৭৪ সালের এপ্রিল মাসে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৭৫ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট তাকে মুক্তির নির্দেশ দানের পরপরই জরুরি আইনের আওতায় আবর গ্রেফতার করা হয়। ৭৫-এর জুনে জেলখানা থেকে আবার ছাড়া পান। ইতিহাসের কালো অধ্যায় ১৯৭৫-এর আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর জাতীয় নেতা তাজউদ্দিন আহমদসহ তাকে আবারও ঢাকা থেকে গ্রেফতার করে তার বিরুদ্ধে এক মিথ্যা মামলা দায়ের করে সামরিক আইনের আওতায় সাজা দেয়া হয়। ১৯৭৫-এর আগস্ট হতে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছর বন্দি জীবন যাপন করেন। বন্দি অবস্থায় তৎকালীন সামরিক শাসক ও বাংলার রাজনীতিতে অনেক ঘটনা-দুর্ঘটনার নায়ক এবং বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা স্বঘোষিত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তাকে নানা প্রলোভন দেখিয়ে তার দলে যোগদান করার প্রস্তাব দেন। সচেতন এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বলীয়ান বলে স্বভাবতই তিনি জিয়ার সব প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। সব রক্তচক্ষু ও সব ধরনের চাপ এবং অত্যাচারের পরও মানিক চৌধুরীকে জেলে আটক রাখতে পারেনি সামরিক সরকার। এক সময় সরকার তাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।
১৯৮০ সালের ১৮ মার্চ মানিক জেলখানা হতে মুক্ত হন। জেলে থাকা অবস্থায় অমানুষকি নির্যাতনের ফলে ভেতরে ভেতরে ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন। জেল থেকে মুক্ত হবার পর তিনি চিকিৎসার জন্য তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু সাবেক মন্ত্রী ও রাষ্ট্রদূত ঢাকার গাজীপুরের সামসুল হককে সঙ্গে নিয়ে কলকাতায় গমন করেন। কলকাতায় চিকিৎসকরা বলেন, তার চিকিৎসার দেরি হওয়ার কারনে এবং জেলের খাটুনিতে দুরারোগ্য ব্যাধি তাকে দুর্বল করে ফেলেছে। ফলে সব বাধা ও বান্ধনকে পেছনে ফেলে ১৯৮০ সালের ৩০ জুন ভোরে কলকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্বাধীনতা সংগ্রামের বীর সৈনিক মানিক চৌধুরী পরলোক গমন করেন। চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনের সিংহপুরুষ মানিক চৌধুরী। রাজনীতি বা দেশের জন্য তিনি শুধু দিয়ে গেছেন কিছু প্রাপ্তির আশা করেননি। এ মহান বীর মুক্তিযোদ্ধা চট্টলাপ্রেমী মানুষটিকে স্মরণ করা সবার নৈতিক দায়িত্ব।
রাজনৈতিক কর্মকান্ডে সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়াও প্রয়াত মানিক চৌধুরী বিভিন্ন জনহিতকর সামাজিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত ছিলেন। হাবিলাসদ্বীপ উচ্চ বিদ্যালয়, হুলাইন সালেহ- নূর কলেজ প্রতিষ্ঠায় তার অবদান অবিস্মরণীয়। মানিক চৌধুরীর মতো নক্ষত্রসম ব্যক্তিরা আমাদের প্রজন্মের জন্য নমস্য পুরুষ। কিন্তু আমরা অকৃজ্ঞ জাতি এসব মহান ব্যক্তির স্মরণ করতে কৃপণতা করি। বর্তমান প্রজন্মের জন্য এবং জাতির এ সময়ে মানিক চৌধুরীর মতো নেতার খুবই প্রয়োজন। চট্টগ্রামের রাজনীতিতে মানিক চৌধুরীর মতো আদর্শবান রাজনীতিবিদকে স্মরণ করার মাধ্যমে আমরা আমাদের বর্তমান প্রজন্মের জন্য একটি প্রকৃত বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা বাস্তবায়ন করতে পারব।
সূত্রঃঢাকা নিউজ ২৪ডট কম.