স্মরণবিপ্লবী মানিক চৌধুরী
দেশের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে দুজন আওয়ামী লীগ নেতা, তিনজন
সিভিল (সিএসপি) কর্মকর্তাসহ নৌ, বিমান এবং সেনাবাহিনী থেকে প্রত্যক্ষভাবে
জড়িতদের চিহ্নিত করে মোট ৩৫ জনকে চার্জশিটভুক্ত আসামি করে রাষ্ট্রদ্রোহ
মামলা রুজু করা হয়। ১৯৬৮ সালের ১৯ জুন এ রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় ১১ জনকে
রাজসাক্ষী এবং দুই শতাধিক সামরিক ও বেসামরিক লোককে সাক্ষী করা হয়। সশস্ত্র
বাহিনীর সহস্রাধিক সদস্য বেসামরিক কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং রাজনৈতিক নেতাকে
গ্রেফতার করা হয়। এই মামলার আসামি হিসেবে আমাকেও গ্রেফতার করা হয়। ঢাকা
সেনানিবাসে স্পেশাল ট্রাইব্যুনালে মামলাটিকে রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব এবং
অন্য শিরোনামে রুজু করা হলেও এটাকে দুরভিসন্ধিমূলকভাবে ভারতের ষড়যন্ত্র
হিসেবে প্রচার করা হয়, যাতে করে স্বাধীনতাকামী সৈনিক-জনতার বিরুদ্ধে সাধারণ
মানুষকে ক্ষেপিয়ে তোলা যায় ও শেখ মুজিবসহ বিপ্লবী সংগঠকদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে
স্বাধীনতা আন্দোলনকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া যায়। ১৯ জুন মামলা শুরু
হওয়ার পর আমার সঙ্গে পরিচয় ঘটে অভিযুক্ত চট্টগ্রামের সিটি আওয়ামী লীগের
নেতা বিভূতিভূষণ চৌধুরী ওরফে মানিক চৌধুরী এবং বিধানকৃষ্ণ সেনের সঙ্গে।
বিচার চলাকালে সব অভিযুক্তের সঙ্গে আমার সখ্য হলেও মানিক চৌধুরীর
কথাবার্তায় আমি তার প্রতি বিশেষভাবে আকৃষ্ট হই। মানিক চৌধুরী ও বিধানকৃষ্ণ
সেনের সঙ্গে আমার দেখা হতো প্রতিদিন বিকেলে কারাগারের খোলা চত্বরে অথবা
খাবার ঘরে। তখন দেখতাম মানিক চৌধুরীর ওপর পাকিস্তানিদের পাশবিক নির্যাতনের
চিহ্ন। নির্যাতনে তার কান ও একটা চোখ অকেজো হয়ে যায়। আমাদের ওপর নির্যাতন
হলেও লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন, বিধানকৃষ্ণ সেন, মানিক চৌধুরী এবং
স্টুয়ার্ড মুজিবের ওপর নির্যাতনের মাত্রা ছিল সীমাহীন। দেখতাম মানিকদা
খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছেন, তবুও তিনি নিম্নস্বরে হাসিমুখে আমাদের সঙ্গে কথা
বলতেন। গৌরবর্ণ ও মাঝারি গড়নের শান্ত সৌম্য মানিক চৌধুরীর অগাধ
দেশপ্রেম, দেশকে নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার সঙ্গে
পরিচিত হয়ে আমি মুগ্ধ হই। অনেক কথাই হয়েছে তার সঙ্গে। মতান্তরও ছিল কিছু
বিষয়ে, কিন্তু মনান্তর হয়নি এক মুহূর্তের জন্য। বন্দি দিনগুলোতে মানিকদার
কথোপকথন আমাকে স্মরণ করিয়ে দেয় অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির
প্রয়োজনীয়তা। মামলা চলাকালে বঙ্গবন্ধু তার জামাতা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী
শেখ হাসিনার স্বামী প্রয়াত ওয়াজেদ মিয়ার মাধ্যমে তখনকার ডাকসুর ছাত্রনেতা
তোফায়েল আহমেদকে আত্দীয় পরিচয়ে অতি গোপনীয়তার সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে
মুক্তির আন্দোলন এবং পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলাপ করতেন। মুক্তির
আন্দোলন যখন চরমে ওঠে তখন ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ সালে ঢাকা সেনানিবাসে আটক
অবস্থায় টয়লেটে যাওয়ার সময় সার্জেন্ট জহুরুল হক এবং ফ্লাইট সার্জেন্ট ফজলুল
হককে এক পাকিস্তানি নিরাপত্তারক্ষী সামনাসামনি গুলি করে ও মৃত্যু নিশ্চিত
করার জন্য জহুরুলের শরীরে বেয়নেট চার্জ করে। পরে তিনি সিএমএইচে মারা যান। এ
ঘটনার পর আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে ও বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক অগি্নসংযোগের
ঘটনা ঘটে, যা পরে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। সরকার বিনা শর্তে ২২
ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ মামলা প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয়। মামলা প্রত্যাহারের
পর দেশজুড়ে প্রাথমিক বিজয়ের আনন্দ-হিল্লোল বয়ে যায়। শেখ মুজিবসহ সব
অভিযুক্ত মুক্তি লাভ করলে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯
সালে শেখ মুজিবকে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় 'বঙ্গবন্ধু' উপাধিতে
ভূষিত করে। এই মামলায় চট্টগ্রাম থেকে আমরা যারা অভিযুক্ত ছিলাম তাদের
চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে প্রয়াত মন্ত্রী জহুর আহম্মদ চৌধুরীর
নেতৃত্বে সংবর্ধনা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। মানিক চৌধুরী, বিধানকৃষ্ণ সেন
এবং আমাকে বিপুল জনতার উপস্থিতিতে বিজয়মালায় অভিষিক্ত করা হয়।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা একটি অন্যতম মাইলফলক। স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে এ মামলার গুরুত্ব অপরিসীম। আগরতলা মামলাকে কেন্দ্র করে যেসব ঘটনা ঘটে সেগুলোই স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি অন্যতম স্রোতধারা।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে মুখ্য ভূমিকা পালনকারী হিসেবে অনেক রাজনৈতিক নেতার নাম উচ্চারিত হয়। কিন্তু আমার ভাবতে অবাক লাগে মানিক চৌধুরী ও বিধানকৃষ্ণ সেনসহ মামলার অভিযুক্ত অন্য বিপ্লবীদের আমরা কিভাবে ভুলে গেলাম।
মাহ্ফুজুল বারী, টরন্টো, কানাডা
বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা একটি অন্যতম মাইলফলক। স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে এ মামলার গুরুত্ব অপরিসীম। আগরতলা মামলাকে কেন্দ্র করে যেসব ঘটনা ঘটে সেগুলোই স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি অন্যতম স্রোতধারা।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে মুখ্য ভূমিকা পালনকারী হিসেবে অনেক রাজনৈতিক নেতার নাম উচ্চারিত হয়। কিন্তু আমার ভাবতে অবাক লাগে মানিক চৌধুরী ও বিধানকৃষ্ণ সেনসহ মামলার অভিযুক্ত অন্য বিপ্লবীদের আমরা কিভাবে ভুলে গেলাম।
মাহ্ফুজুল বারী, টরন্টো, কানাডা