মানিক চৌধুরীর মরণোত্তর সন্মাননা গ্রহণ করছেন দীপংকর চৌধুরী কাজল ২৭ ২ ২০১১ইং

রবিবার, ৬ মার্চ, ২০১৬

স্বাধীনতা সংগ্রামী মানিক চৌধুরী: মৃত্যুঞ্জয়ী বীর

মোহাম্মদ জোবায়ের

বীরপ্রসবিনী চট্টগ্রামের প্রয়াত বীরনেতা মানিক চৌধুরীর কথা এখন আর কোথাও তেমন উচ্চারিত হতে শুনিনা। এ নামে যে একদা একজন ত্যাগী নেতা ছিলেন সে কথা হালের রাজনীতিকদের খুব একটা মালুম আছে বলেও আমার মনে হয় না। একেতো আমাদের ইতিহাস বিমুখতা আছে তার উপর ইতিহাসবিকৃতি। এসব মিলিয়ে শুধু কি মানিক চৌধুরী আরো কতো কতো একদার যশস্বী নেতা বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে গেছেন। অথচ এসব বীর সন্তানদের ত্যাগের উপর আমাদের বর্তমানের ভিত্তিটা প্রতিষ্ঠিত। যাদের গড়ে দেয়া ভিত্তির উপর আমরা দাঁড়িয়ে আছি সেই তাঁদের ভুলে থাকা অপরাধের সামিল নয় কি? আমি যে মানিক চৌধুরীর কথা বলছি তার সম্পর্কে কতিপয় প্রবীণ নেতার আড্ডায় খুব কদাচিত কিছু কিছু বাতচিৎ শুনেছি বটে তবে সেসব শোনা কথা আমার মধ্যে উক্ত ব্যক্তি সম্পর্কে কোন স্পষ্ট ধারণা তৈরি করতে পারেনি। ইতিহাস পাঠক হিসেবে বিভিন্ন সময়ে আমি মানিক চৌধুরী সম্পর্কে আদ্যোপান্থ জানতে কৌতুহলবোধ করেছি। কিন্তু সময় ও সুযোগের অভাবে ঐ ক্ষীণ কৌতুহল থেমেই ছিল, নিবৃত্তি ঘটাতে পারিনি বহুদিন। সহসা একদিন মানিক চৌধুরীর জ্যেষ্ঠ পুত্র দীপঙ্কর চৌধুরী যাকে কাজলদা নামেই ডাকি তিনি আলাপচারিতায় জানালেন, তার স্বর্গীয় পিতা মানিক চৌধুরীর (যার পোশাকী নাম ভূপতি ভূষণ চৌধুরী) দীর্ঘজীবনের সাথে ঘনিষ্ঠ মানুষদের বক্তব্য সম্বলিত একটি স্মারকগ্রন্থ আছে। আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আমি সেটা পড়েছি কিনা। আমি লজ্জিত হয়ে না সূচক জবাব দিলাম। ফল হলো, তিনি দ্রুত আমাকে শ্রদ্ধেয় সাংবাদিক নাসির উদ্দিন চৌধুরী সম্পাদিত “মানিক চৌধুরী: স্বাধীনতা সংগ্রামের বিস্মৃত নায়ক” নামক স্মারক গ্রন্থটি সরবরাহ করেন। হাতে পেয়েই প্রায় ঝড়ের বেগে ৩০৮ পৃষ্ঠার সুখপাঠ্য বইটি শেষ করলাম। বইটি পড়ে প্রথমেই আমার মনে এলো- কালের করাল গ্রাসে কতো বড় একটি মানুষ প্রায় আড়াল হয়ে আছেন! একটি বড় দালান গড়তে কতো ইটকে চূর্ণ ও খণ্ড বিখণ্ড করতে হয়। একটি দেশ গড়তে কতো মানুষকে প্রাণ দিতে হয়। মানিক চৌধুরী ইতিহাসের সেই বিখণ্ড ইট যারা চূর্ণ হয়ে এ দেশটি গড়ে তুলেছেন। তাদের কথা হয়তোবা ইতিহাসে তেমন গুরুত্বের সাথে লেখা রবে না শুধু মাঝে মাঝে কৃষাণের মুখে... শ্রমিকের মুখে ধ্বনিত হবে। মানিক চৌধুরীর আলোচনার শুরুতে এভাবেই একটি সান্ত্বনা পেতে চেষ্টা করছি। বইটিতে মানিক চৌধুরীর সাথে পরিচিতজনরা স্মৃতির ঝাঁপি খুলে বসেছেন সংক্ষিপ্ত রোমন্থনে। সংগৃহিত নিবন্ধনসমূহে ভিন্ন ভিন্ন মেজাজ ও গুণাবলীর মানিক চৌধুরীর ভেতর থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ মানিক চৌধুরী আত্মপ্রকাশ করেছে। অবশ্য একটি ক্ষুদ্র বইয়ে একজন বিশাল মানুষকে ধরার চেষ্টা সার্থকভাবে হয়েছে এটা নিশ্চত করে বলা যায় না। এ বই পাঠ করার পর মানিক চৌধুরীর সম্পর্কে জানার স্পৃহা আমার আরো তীব্র হয়। তাই ব্যক্তি পর্যায়ে আরো কিছু অনুসন্ধান করি এবং আরো কিছু সহায়ক পুস্তক পাঠ করি। পরিশেষে আমি সিদ্ধান্তে উপনীত হই যে, বড় নেতা অনেক দেখা যায়- বড় মাপের মানুষ কদাচিত দেখা মেলে। মানিক চৌধুরী ছিলেন তেমনি ক্ষণজন্মা বড় মাপের মানুষ।

বাংলাদেশ স্বাধীনতার ইতিহাসে একটি বিশেষ চরিত্র ভূপতি ভূষণ চৌধুরী ওরফে মানিক চৌধুরী। ইতিহাসের গভীর নিরীক্ষকবৃন্দ এ চরিত্রটি সম্পর্কে জানতে নিঃসন্দেহে উৎসাহী হবেন; কারণ বিরল ত্যাগের মহিমাসম্পন্ন এ চরিত্র আপন উজ্জ্বল্যেই গবেষকদের তার দিকে মনোযোগী হতে বাধ্য করবেন। যদিও এখন মানিক চৌধুরী নামটি রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে এখন বিশেষ আলোচিত হয় না। তার মানে এ নয় যে, মানিক চৌধুরী ফুরিয়ে গেছেন। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে ততদিন আজন্ম সংগ্রামী মানিক চৌধুরীর অবদানও বাংলাদেশের সাথে জড়িয়ে থাকবে। যদিও হতাশার কথা এ যে, এখন এ মহান ব্যক্তির জন্মদিন মৃত্যু দিবস নিরবে আসে নিরবে যায়। অবশ্য এরকমটিরই হবার কথা। কারণ মানিক চৌধুরীরা যে আত্মদানের ব্রত নিয়ে রাজনীতি করতেন সেই শুদ্ধাচার এখন রাজনীতিতে সত্যিকার অর্থেই অনেকাংশে অনুপস্থিত। এখন চরম নীতিভ্রষ্টতার তোড়ে মূল্যবোধ সম্পন্ন রাজনীতির কদর নিঃশেষিত প্রায়। স্বাধীনতা যুদ্ধের সূত্ররচনাকারী ব্যক্তি মানিক চৌধুরীর নামে তাই আজো নগরীতে কোন রাস্তার নামকরণ হয়নি, কোথাও তার নামে একটি স্মৃতিস্তম্ভ হয়নি, ভাস্কর্য হয়নি। দেশ স্বাধীন হবার পর যে মানুষটি বীরত্বের জন্য জাতীয় বীর হিসেবে স্বীকৃতি পাবার কথা সেই মহাপ্রাণ মানুষটি রাষ্ট্রীয় অত্যাচারে জর্জরিত হয়ে দেশ স্বাধীন হবার ১০ বছরের মাথায় অনাকাঙিক্ষত মৃত্যুকে বরণ করেন। সত্যিই সেলুকাস কি বিচিত্র এ দেশ। বাংলাদেশ ও বাঙালিদের ইতিহাসে এ ধরনের আরো বহু আফসোস করার মতো ঘটনার উদ্ধৃতি দিয়ে দেখাতে পারবো কোথাও কোথাও খলেরা বীর হয়েছে, বীরেরা পিঁপড়ার মতো মরেছে। তবুও আমি ভীষণ আশাবাদী যে, একদিন প্রকৃত বীরের ত্যাগের স্বীকৃতি বাংলাদেশ দেবে। ইঞ্ঝিত সূর্য মেঘের আড়াল ভেঙে উঁকি দেবেই।

কিছু কিছু মানুষের জীবন প্রকৃত অর্থেই ট্রাজেডির করুণরসে ভরপুর থাকে। মহামতি মানিক চৌধুরীর জীবনও তেমনিতর ট্রাজিডির রসে টইটম্বুর। যার সম্পর্কে পুরোটা পাঠ করার পর যে কেউ একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলবেন ‘আহা’। মানিক চৌধুরী ৫০ বছরের অধিক বাঁচেননি। জন্মসন ১৯৩০ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে মৃত্যুসন ১৯৮০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত হিসেব করলে এ রকমই দাঁড়ায়। তাহলে মানিক চেধুরীর এ মৃত্যুকে অকাল মৃত্যু বলা কি সমীচীন নয়। আরো একটু বেশি বাঁচার দাবি পৃথিবীতে তিনি রেখেছিলেন কিন্তু হাসপাতালের বেডে তার দেহ নিথর হলে দেশবাসী জানলো বিধাতার কাছে সে আবেদন নামঞ্জুর হয়েছে। মানিক চৌধুরীর মৃত্যুকে আমি অস্বাভাবিক মৃত্যুও বলতে চাই। একনায়ক জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসনের ছোবল মানিক চৌধুরীর মতো বহু বীর মুক্তিযোদ্ধার জীবনী শক্তি কেড়ে নিয়ে নিঃসাড় করে দিয়েছিল। মানিক চৌধুরীও সামরিকজান্তার স্বেচ্ছাচারিতার বলি মাত্র। ১৯৭৫ সালের ২১ আগস্ট থেকে ১৯৮০ সালের ১৮ মার্চ পর্যন্ত কারাগারে দুর্বিষহ দিনাতিপাত-শারীরিক মানসিক নির্যাতনে মানিক চৌধুরীর স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ে। প্রায় বিনা চিকিৎসায় তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার ১২ নং আসামীটি মৃত্যুবরণ করেন। ইতিহাসের গতিপথ বদলকারী সেই আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় ৩৫ জন আসামী ছিলেন। ৩৫ জনের মধ্যে একেবারের প্রথম জন ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের জনরোষ ফেটে পড়ে এবং এতে করে স্বাধীনতার পথ খোলাসা হয়। এ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা হতে অব্যাহতি পাবার পর শেখ মুজিব ছাত্র জনতা কর্তৃক বঙ্গবন্ধু খেতাবে ভূষিত হন। সুতরাং আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা ও এর অভিযুক্তরা ইতিহাসের সূর্যসন্তান। মানিক চৌধুরী খাঁটি সোনায় গড়া নিখাদ দেশপ্রেমিক এক অকুতোভয় সূর্যসন্তানই ছিলেন। নীতির প্রশ্নে আপোস করতে না পারার কারণে পরিশেষে তাকে তার নেতা বঙ্গবন্ধুর মতো করুণ পরিণতিই বরণ করতে হয়। প্রতিবিপ্লবী শক্তির ষড়যন্ত্রে বাংলাদেশের স্বাধীনতা এভাবেই লাঞ্চিত হয় প্রথমার্ধে।

মানিক চৌধুরী রাজনৈতিক জীবনে চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষের চেয়ে বড় পদ অলংকৃত করেননি। অবশ্য পদের ভূখা তিনি কখনো ছিলেন না। রাজনীতির প্রতি আগ্রহ থাকলেও পদনীতির প্রতি তার আগ্রহ বেজায় রকমের কমই ছিল। মানিক চৌধুরী ছিলেন মুখ্যত স্বাধীতার সাধক। স্বাধীনতার জন্য তিনি ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন, আবার পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধেও লড়েছেন। দু’দুটো স্বাধীনতা সংগ্রামের সৈনিক মানিক চৌধুরীর জীবন বর্ণাঢ্য এবং ঘটনাবহুল। বিশেষ করে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সঠিক ইতিহাস রচনা করতে গেলে মানিক চৌধুরীর নাম অনিবার্যভাবেই আসবে। আপোসহীন এক স্বাধীনতা সংগ্রামীর নাম মানিক চৌধুরী। একটি পারিবারিক মামলার সূত্রে গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সংস্পর্শে আসেন তিনি। এ সুবাদেই সোহরাওয়ার্দীর ভাবশিষ্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সান্নিধ্যে রাজনীতিতে জড়িয়ে যান। বঙ্গবন্ধুর সাথে গড়ে ওঠে তার অটুট বন্ধন। বঙ্গবন্ধুর সাথে মানিক চৌধুরীর সম্পর্ক নেতা ও কর্মীর সম্পর্ক বলে সরল ব্যাখ্যা করা যায় না। বরং বঙ্গবন্ধুর সাথে তার সম্পর্ক ছিল বহুমাত্রিক। সম্পর্কের পুরোটা জুড়ে ছিল ভালোবাসা, নির্ভরতা, আস্থা ও ভরসা। বঙ্গবন্ধু যখনই সংকটে পড়েছেন তখনই মানিক চৌধুরীর দ্বারস্থ হয়েছেন। মানিক চৌধুরী হৃদয় প্রসারিত করে এগিয়ে গেছেন বঙ্গবন্ধুর দিকে। বঙ্গবন্ধুর ছায়াসঙ্গী ছিলেন তিনি। বঙ্গবন্ধু মর্ম ও নর্ম এর সাথে মানিক চৌধুরীর ঐকতান ছিল। ১৯৬৬ সালে বাঙালির মুক্তির সনদ ৬ দফা আন্দোলনের প্রচারের জন্য ইত্তেফাকের বিকল্প হিসেবে ‘আওয়াজ’ নামক পত্রিকা পরিচালনার নির্দেশনা বঙ্গবন্ধু মানিক চৌধুরীকে দিয়েছিলেন। ৬ দফা সমর্থনে পোস্টার ও পুস্তিকা প্রকাশের অর্থায়ন করেন মানিক চৌধুরী। শুধু ৬ দফা নয় স্বাধীনতা সংগ্রামের রাজনীতির জন্যই বঙ্গবন্ধুকে অংশীদার করে ‘নতুন এজেন্সী’ নামক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ফাঁদেন তিনি। এভাবে আরো কতো কি। বঙ্গবন্ধুকে মানিক চৌধুরী এমন কতক বিষয়ে সহযোগিতা করতেন যেগুলোর জন্য বঙ্গবন্ধু মানিক চৌধুরীর উপর বেশ নির্ভর করতেন। রাজনীতি, বঙ্গবন্ধু, স্বাধীনতা সংগ্রামের কাজ করতে গিয়ে ইতিহাসের অনেকগুলো চরিত্রের সাথে মেলবন্ধনে জড়িয়ে ছিলেন মানিক চৌধুরী। স্বল্পায়ত জীবনে তিনি কতো না মানুষের স্মৃতিপটে আঁচড় কেটে ছিলেন। ভাবলে অবাক হতে হয়, সকলের কাছে গৌরবর্ণ ও মাঝারি গড়নের শান্ত সৌম্য মানিক চৌধুরীর গ্রহণ যোগ্যতা ছিল প্রশ্নাতীত। চট্টগ্রামের দিকপাল রাজনীতিক এম এ আজিজ ও জহুর আহমদ চৌধুরীর মধ্যকার সংযোগ সেতু ছিলেন মানিক চৌধুরী। জীবনের ১১টি বছর জেলে কাটিয়েছেন, সেখানে ভীবৎস অত্যাচার তাকে চোষে খেয়েছে। সামরিক শাসক জিয়া তাকে কতো প্রলোভন দেখিয়েছিলেন। প্রলোভনের মোহে তিনি ভুলেন নি। তিনি গণতান্ত্রিক অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির নিষ্ঠাবান কর্মী হিসেবে মৃত্যুবরণ শ্রেয় বিবেচনা করেছিলেন। তার রাজনীতির আদর্শিক পক্ষপাত বুঝা যায়, স্বাধীনতার পর আওয়ামীলীগের সাথে দুরত্ব হলে তিনি জাতীয় গণতান্ত্রিক মুক্তি আন্দোলন (জগমুই) নামক দলে যোগদান করেন। জাসদ বা উগ্রপন্থী কোন খতমী দলে যোগ দিয়ে তিনি বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে বিষোদগার করেননি। তিনি শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখতেন। ক্ষমতার চেয়েও তার কাছে জাতীয় মুক্তির প্রচেষ্টা আলবৎ জরুরি ছিল। বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের বাঁকে বাঁকে তাঁর উজ্জ্বল অংশগ্রহণ দেখা যায়। সমসাময়িক কালের বহু প্রতিষ্ঠিত ও তারকা রাজনীতিক মানিক চৌধুরীর পৃষ্ঠপোষকতাতেই সৃষ্টি হয়েছিল। সকলের সাথে তিনি এমনই সহজ হৃদ্যিক আচরণ করতেন যে, তার সাথে প্রত্যেকের মানিয়ে চলার মতো সম্পর্ক গড়ে ওঠতো। তাম্বুল রসে রাঙা থাকতো যার মুখ সেই মানুষটি যে কত বড় মাপের লোক ছিলেন তা তিনি কাউকে ঘুণাক্ষরেও বুঝতে দেননি। ভারতের সাথে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিষয়ে নানা কৌশলগত যোগাযোগে তাঁকে বেশ বলিষ্ঠ ভূমিকায় দেখা যায়। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক নেতা হয়েও তার দৌড় ছিল স্বয়ং ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী পর্যন্ত। বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের স্বার্থেই তাকে ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে গুরু দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। তিনি আওয়ামী লীগের সকল মিটিং মিছিলে সক্রিয় অংশগ্রহণ ও পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। লালদীঘি পাড়ের তদানীন্তন প্রখ্যাত বীণা কোম্পানির কাছে প্রচারণার মাইকের খরচ পোষিয়ে দেয়া থেকে শুরু করে কর্মীদের আদর আপ্যায়নে মুক্তহস্তে এগিয়ে যেতেন মানিক চৌধুরী। তিনি দেশের তদানীন্তন তাবৎ নেতাদের সাথে বন্ধুত্ব ও দুঃসময়ে অর্থ সাহায্য দিতেন অথচ তিনি কখনোই নেতাগিরি ফলাতেন না। এমন প্রচার বিমুখ ছিলেন তিনি। অন্যদিকে তার সাহসের তারিফ না করে কি উপায় আছে? মুক্তিযুদ্ধের সময় যাত্রাবাড়ীতে গেরিলা দল নিয়ে প্রবেশ করেন তিনি। যুদ্ধের সময় আলী আহমদ মাষ্টারের ছদ্মবেশ ধারণ করে ঢাকার পথে পথে ঘুরে বেড়িয়েছেন। মানিক চৌধুরীর জীবনের নানা ঘটনা পাঠ করলে সে সময়কার রাজনীতির পরিবেশ, প্রতিবেশ সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাওয়া যায়। একটি তুমুল সময়ে চট্টগ্রামের রাজনীতিতে আজীজদা, জহুরদা, মানিকদা এই দাদা ত্রয়ী অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে ছিলেন। তারাই ছিলেন বঙ্গবন্ধুর পরীক্ষিত দক্ষিণহস্ত। এদের মধ্যে স্পর্ধা ত্যাগ, সাহস, মনোবল সবমিলিয়ে মানিক চৌধুরী ছিলেন ভিন্নমাত্রার মানুষ। তখন জনশ্রুতি ছিল বঙ্গবন্ধুর তিনজন মানিক আছেন : একজন ইত্তেফাকের সম্পাদক মানিক মিয়া, আরেকজন চট্টগ্রামের বিভূতি ভূষণ চৌধুরী মানিক, অপরজন গাজী গোলাম মোস্তফা যার ডাক নামও মানিক। একজন বঙ্গবন্ধুর বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠাতে এই মানিকদের বিরাট অবদান ছিল।

চট্টগ্রাম ছিল মানিক চৌধুরীর আবাস বা ভিত্তিভূমি। পটিয়া উপজেলার হাবিলাসদ্বীপ তাঁর জন্মস্থান। সেখান থেকে পারিবারিক ব্যবসাসূত্রে ৩৯ রামজয় মহাজন লেইন তাদের ছিল জমিদার পরিবার কিন্তু তিনি সেই জমিদারীর ল্যাগাসী বহন করে উৎপীড়ক ও প্রতিক্রিয়াশীল হননি। ব্যতিক্রমভাবে তিনি হয়েছেন মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন দানবীর। জাত ব্যবসায়ী পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করলে অপরাপর বণিকদের মতো খাতুনগঞ্জের গদিতেই তাকে সীমিত থাকতে হতো কিন্তু নিয়তি মানিক চৌধুরীকে টেনে নিয়ে গেছে ঢাকা, করাচি, রাওয়ালপিন্ডি পর্যন্ত। আরো বড় ক্যানভাসে দেশ ও মানুষের প্রতি ভালোবাসার ভূমিকা রাখার নিয়তি যার, তিনিতো রাজসুখ ত্যাগ করবেনই। তাই মানিক চৌধুরীর গদি ছিল রাজনৈতিক নেতাদের পদভারে মুখর।

ইতিহাসের সন্তান মানিক চৌধুরী আজ আমাদের মাঝে নেই। আছে তাঁর অবিনশ্বর কীর্তি বাংলাদেশ। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে মানিক চৌধুরী এই বাংলাদেশের লালসবুজের মধ্যেই বেঁচে থাকবেন। আজ থেকে ৩৫ বছর আগে সর্বজনপ্রিয় মানিকদা ধরাধাম ত্যাগ করলেও মৃত্যুতে তিনি নিঃশেষ হয়ে যাননি। মানিক চৌধুরীর মতো সাহসী, অদম্য, দানবীর, মহৎপ্রাণ মানুষ নিঃশেষ হতে পারেন না। বানোয়াট ইতিহাস ও অপইতিহাসের জঞ্জাল ভেদ করে তিনি সত্যের দীপশিখা হয়ে বিরাজ করবেন। স্বাধীনতা ও দেশের জন্য প্রতিদান না চেয়ে তাঁর যে আত্মদান তা বৃথা যেতে পারে না। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, বাংলাদেশের আগামী প্রজন্মের নাগরিকরা ধর্মীয় গোঁড়ামীমুক্ত, পরার্থপর, কর্মীবান্ধব নেতা মানিক চৌধুরীকে যথাযথ স্মরণ ও অনুসরণ করবে। আমরা যুগে যুগে এমন সংস্কারমুক্ত মানুষের জন্মই প্রত্যাশা করবো। লেখকঃ রাজনৈতিক কর্মী ও কলাম লেখক।
- See more at: http://dainikazadi.org/details2.php?news_id=3261&table=june2015&date=2015-06-30&page_id=19&view=&instant_status=#sthash.YCaiCxV6.dpuf

কোন মন্তব্য নেই: